লেখিকা ইরাবতীর বড় গল্প শকুন্তলা (১)
১.
প্রাচীনকালে এক ঋষি ছিলেন বিশ্বামিত্র । তিনি পূর্বে ছিলেন রাজা কৌশিক। ঋষি বশিষ্ট্যের সঙ্গে ক্ষমতায় না পেরে ওঠার জন্যে তপস্যার গো ধরলেন। ব্রহ্মর্ষি হবেন। কিন্তু এতে বিপদ হল দেবরাজ ইন্দ্রের। পাছে মর্তে আবার এক রাজা তপস্যা করে তার স্বর্গ রাজ্য দখল করে। ইন্দ্রকে তো কিছু করতেই হবে তখন ঠিক করলেন অপ্সরা দ্বারা বিশ্বামিত্রর তপস্যা ভঙ্গ করবেন।
স্বর্গের ছয় অপ্সরা উর্বশী, মেনকা, রম্ভা, তিলোত্তমা, ঘৃতাচী এবং পুঞ্জিকাস্থল। ।এরা ইন্দ্র সভায় নর্তকী কিন্তু মাতৃদেবী । কাহিনী বলে মেনকার উত্থান সমুদ্র মন্থন থেকে। অপ্সরা শব্দ ‘অপা’ অর্থাৎ জল থেকে এসেছে। এরা জীবন ও প্রাণের উৎস, হয়ত বা প্রকৃতির নারী ।ঊর্বশী মেনকা এইগুলি হয়ত এক একটি উপাধি। যেই মাতৃগোষ্ঠী গুলি ইন্দ্রের আধিপত্য স্বীকার করে নিয়েছিলেন হয়ত । তবে অপ্সরারা প্রকৃতিতে থাকতে চেয়েছিল স্বাধীনভাবে । কোনো কালে কারোর স্ত্রী বা কন্যা হতে চাননি।
সবসময় যুদ্ধে খুব কাজ হয় না তাই এই অপ্সরারা ইন্দ্রের গোপন অস্ত্র। ইন্দ্রের কথা মতো মেনকা মর্তে নেমে এলেন। বিশ্বামিত্রের আশ্রম পুষ্কর সরোবরের তীরে। তার তপস্যার জন্য চতুর্দিক রুক্ষ সুক্ষ । মেনকা আসাতেই যেন সব বদলে গেল। গাছে সবুজ পাতা, এল পাখিরা গান গাইতে লাগল। বিশ্বামিত্রের তপস্যা ভঙ্গ হল। চোখ খুলে দেখলেন পুষ্কর সরোবর থেকে মেনকার উত্থান। সে এক অপরূপ দৃশ্য। বিশ্বামিত্র চোখ ফেরাতে পারলেন না।
‘মেনকা আমি মদন দ্বারা আহত হয়েছি। তুমি এখন আমার সঙ্গে এই আশ্রমে বাস কর ,’ বিশ্বামিত্র বললেন। মেনকার মর্তে আগমন সার্থক হল। সেই দশ বছর কেটে গেল। এই বারে ইন্দ্রের চিন্তা বাড়ল।
‘বলি এই মর্তলোকে পুরুষদের কি এমন আছে যে স্বয়ং মেনকা আর স্বর্গে ফিরতে চায় না।’ তারপরে আবার ইন্দ্রের আরো দুশ্চিন্তা ঊর্বশী পুরুরুবার কাছে কিছু শর্ত রেখেছিল কিন্তু মেনকা তো কোন শর্তও রাখেনি।
ইন্দ্রানী শচী একদিন এলেন। মেনকাকে দেখে তো হতভাগ।
মেনকার এখন সেই স্বর্গের অপ্সরা নেই এক ঋষির গৃহবধূ। সাজসজ্জা সব ত্যাগ করেছেন।
‘বলি মেনু তুই কি আর স্বর্গে ফিরবি না ?’
‘আমি ওনাকে ভালবেসে ফেলেছি ।’ এইটুকু মেনকা বলল।
‘বোকা মেয়ে যদি ভালবাসিস তবে বুঝিস না যে যতদিন তোর সঙ্গে আছে ততদিন সেই বিশ্বামিত্রর তপস ক্ষয় হচ্ছে।’
মেনকা বুঝতে পারলেন তার এখন মর্তে থাকার সময় ফুরিয়ে এসেছে । ‘আমি স্বর্গে যাব কিন্তু আমি এখন গর্ভবতী।’
মেনকা বিশ্বামিত্র কে বললেন , ‘আপনি আবার তপস্যা করুন । অনেকদিন তো সংসার করেছেন ।’
‘তা তো বটে কিন্তু এখন যা অবস্থা মেনকা কে ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করেনা । বিশ্বামিত্র পূর্বেও বিবাহিত ছিলেন হয়ত বহুগামী রাজা ছিলেন । তার অনেকগুলি পুত্র সন্তান আছে তবে এতটা দুর্বল হয়ত কখনও হয়ে পড়েননি।
বিশ্বামিত্র তপস্যায় গেলেন । মেনকার একটি ফুটফুটে কন্যা সন্তান হল। মেনকা বিশ্বামিত্রের অপেক্ষা করতে লাগলেন।
বিশ্বামিত্র যোগবলে বুঝলেন যে ইন্দ্র মেনকাকে পাঠিয়েছে । একদিন ফিরে এলেন ভারাক্রান্ত । যেন বশিষ্ট্যের কাছে নয় নিজেই নিজের কাছে হেরে গেছেন।
মেনকা মেয়েকে নিয়ে এগিয়ে গেল । কিন্তু বিশ্বামিত্র তো তাকালেন না ।
‘তুমি স্বর্গে ইন্দ্রের কাছে ফিরে যাও ।’
মেনকার পায়ের তলায় মাটি সরে গেল। তবে তো সবই এখন উনি জেনে গেছেন । মেনকা বুঝতে পারছেন না যে ক্ষমা চাইবেন না কি বিশ্বামিত্র ক্রোধিত হয়ে কোন অভিশাপ দেবেন । কিন্তু কিসের ক্ষমা কিসের অভিশাপ? ভাল তো বেসেছেন , সেটা তো আর মিথ্যে নয় এই কন্যা সন্তানও মিথ্যে নয়।
‘আমি তোমাকে কোন অভিসাপ দেব না মেনকা । তুমি ফিরে যাও। কিন্তু এই কন্যাকে গ্রহণ করতে পারব না সবটাই যখন মিথ্যে।’
বিশ্বামিত্র চলে গেলেন । মেনকা পাথরের মত দাঁড়িয়ে রইলেন । তবে যেটা নিয়তি তাই হবে। কন্ব মুনির আশ্রমের কাছে উদ্যানে এই শিশুটিকে ফেলে মেনকা স্বর্গে রওনা হলেন । বড় সাধ ছিল মেয়েটার বিয়ে দেবেন নিজের হাতে। সংসার করা পুরোপুরি হল না। জানি না কেন মেয়েটার জন্য মনটা হঠাৎ কেঁদে উঠল।
Comments
Post a Comment