কুন্তীর আত্মকথা (4)
Epilogue
তারপর শুরু হয় হস্তিনাপুরের পথে যাত্রা। সেই দিন আবার এক যুগ পেরিয়ে পাঁচ পুত্র পাণ্ডু ও মাদ্রীর শবদেহ নিয়ে শতশৃঙ্গ পাহাড় থেকে আমি ফিরে এসেছিল হস্তিনাপুরে। এককালে পান্ডুর গলায় বরমাল্য দিয়ে এসেছিলাম হস্তিনাপুরের রাণী হয়ে। এখন হস্তিনাপুরের দ্বারে এলাম পাঁচ পুত্রের বিধবা মা হয়ে । সেই প্রথম যেদিন হস্তিনাপুরে এসেছিলাম সেই দিনের মত হস্তিনাপুরের প্রাসাদের দ্বারে দাঁড়িয়েছিলেন ভীষ্ম ও সত্যবতী, অম্বিকা ও অম্বালিকা,ধৃতরাষ্ট্র গান্ধারী ও বিদুর। হস্তিনাপুরে যেন সময় থেমে থাকে শুধু জীবনের নির্মম কালচক্র আহত হয়েছি আমি।
শতশৃঙ্গ পাহাড়ের ঋষিরা হস্তিনাপুরে এসে ভীষ্ম ধৃতরাষ্ট্র সত্যবতী ও সকল প্রজাদের পান্ডুর পাঁচ পুত্রের পরিচয় জানালেন । নিয়োগ প্রথা দ্বারা জন্মেছে প্রথমে যুধিষ্ঠির ধর্মপুত্র, তারপর বায়ুপুত্র ভীম , তারপরে অর্জুন ইন্দ্রের পুত্র এবং সবশেষে অশ্বিনকুমারের যমজ পুত্র নকুল ও সহদেব, পান্ডুর ক্ষেত্রে জন্ম নিয়েছে আমার ও মাদ্রীর গর্ভে ।তারপর সেই শতশৃঙ্গের ঋষিরা শীঘ্রই বিদায় নিলেন।
মহারাজা ধৃতরাষ্ট্র বিদুরকে পান্ডুর ও মাদ্রীর শেষকৃত্য সম্পন্ন করতে বললেন । পাঁচ পুত্র পিতার শবদেহ বহন করে কাঁদতে কাঁদতে এগতে লাগল তাদের পশ্চাতে ব্রাহ্মণ ও আত্মীয়রা তারাও শোকাহত । তারপর যখন চন্দন কাঠে পান্ডু ও মাদ্রীর দাহ হল তখন অম্বালিকা ‘হে পুত্র হে পুত্র’ বলে রোদন করতে ধরাতলে মূর্ছিত হলেন। শোকাকুল সত্যবতী, ভীষ্ম রাজা ধৃতরাষ্ট্র বিদুর কৌরবগণ দুঃখিত হয়ে ক্রন্দন করতে লাগলেন। আর হয়ত বা আমার কান্নায় পশু পক্ষীরাও কেঁদে উঠেছিল। তারপর ত্রয়োদশ দিনে পান্ডুর শ্রাদ্ধ সম্পন্ন হলে কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন এলেন ।
কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন সত্যবতীকে বললেন ‘পৃথিবী এখন গত যৌবনা।’
‘কি বলছ দ্বৈপায়ন ?’
‘হ্যা মাতা এখন দ্বাপরের শেষ। আপনি তাই হস্তিনাপুর ত্যাগ করুন। কুরু বংশের ধ্বংস আপনি দেখতে পারবেন না তপবনে বানপ্রস্তে শেষ জীবন যাপন করুন।’
সত্যবতীর সঙ্গে অম্বিকা ও অম্বালিকা অরণ্যে প্রস্থান করলেন । এখন গান্ধারী হস্তিনাপুরের রাণী আর আমি শুধু পান্ডুর বিধবা স্ত্রী। হয়ত আমি আর গান্ধারী সারা জীবনই দুই প্রান্তে প্রতিযোগী হয়ে জীবন কাটিয়ে দেব। প্রথমে নিজেরদের স্বামীর জন্য আজ নিজের পুত্রদের জন্য আর সেই দিন ও আর বেশি দূরে ছিল না। সেইদিন সত্যবতীর যাওয়াটা চোখে সে রকম ভাবে লাগেনি। কিন্তু সেইদিন কুরুবংশ সত্যবতীর বংশ।
ভীষ্ম বারবারই বলছেন যে কৌরবান্ডব দুজনেরই হস্তিনাপুরের রাজ সিংহাসনে সমান অধিকার আছে। ভীষ্ম বলেছেন হস্তিনাপুর পৈতৃক সম্পত্তি। তার মানে কোন পক্ষই কোন আইন ধরে পুরোটা হস্তিনাপুর দখল করতে পারবে না ।যেটা পৈত্রিক সম্পত্তি এবং নিজের পিতার অর্জিত সম্পত্তির আইনের পার্থক্য। ভীষ্ম এই সমস্যার সমাধানে পান্ডুর পরবর্তী প্রজন্মের জ্যেষ্ঠ পুত্র রাজা হবে স্থির করেছিলেন।যেখানে যুধিষ্ঠির জ্যেষ্ঠ কিন্তু তার পুত্র রাজত্ব পাওয়ার আগেই যুধিষ্ঠিরের পর তার ভ্রাতারা ক্রমিক ভাবে সিংহাসন অধিকার পাবে । এই ব্যবস্থা ভাতৃ-তান্ত্রিক যৌথ শাসন ব্যবস্থা। সেই ভ্রাতাদের মধ্যে যুধিষ্ঠিরের পরে দুর্যোধন হবে কিনা ধৃতরাষ্ট্র এই প্রশ্ন করেছিলেন।
কিন্তু আমি এলাম আমার পুত্রদের শ্রেষ্ঠত্ব দাবি নিয়ে । কৌরব বংশের জন্ম হয়েছে ইলার গর্ভ থেকে অর্থাৎ রাজার নারী অংশ থেকে । তাই হস্তিনাপুরে মাতার অর্থ শুধু গর্ভধারিণী নয় তার অর্থ একজন সফল রাজনৈতিক ও দক্ষ কূটনৈতিক। যুধিষ্ঠির ধার্মিক, ভীম শক্তিশালী এবং অর্জুন বীর । আর বিদুর তো ছিল এই শ্রেষ্ঠত্বের প্রবক্তা হিসাবে । তাই আমি সেদিন হস্তিনাপুরের সেই মাতা হয়ে এসেছিলাম যে শুধু এক প্রজন্মকে জন্ম দেয় তা নয় সে সেই প্রজন্মকে সিংহাসনে প্রতিষ্ঠিতও করে। আর সেই অর্থে আমি সেই দিন পান্ডুর স্ত্রী বা হাস্তিনাপুরে রাণী ছিলাম না চিরকালের জন্য হয়েছিলাম পঞ্চপান্ডবের মাতা ।
Comments
Post a Comment