নিবেদন

গতবার ‘প্রদীপ’ পত্রিকার ভূমিকায় লিখেছিলাম যে যদি ‘প্রদীপ’ পত্রিকায় প্রগতিশীল লেখা প্রকাশিত হয় তবে পত্রিকা জনপ্রিয় হবে । কিন্তু চারপাশের মানুষদের জীবনধারা বা কথাবার্তা শুনে মনে হয় যে আমাদের সমাজে বর্তমানে ‘প্রগতি’ বা ‘প্রতিক্রিয়া’ বলে বাংলা ভাষায় কোন শব্দ নেই ।

বহু মানুষদের চিনি বা জানি যারা উচ্চশিক্ষিত বা আর্থিকভাবে ক্ষমতা সম্পন্ন কিন্তু তাদের জীবনসংস্কৃতি মোটামুটি ভাবে আধুনিক বলে গণ্য করা যায় না ।

বর্তমানে আমাদের সমাজে সব মানুষই স্ব -ক্ষমতা বৃদ্ধি করে ভোগ্যপণ্য ক্রয় করতে চাইছে।  কিন্তু দারিদ্রতা, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বৈষম্যের জন্য বহু মানুষ  সক্ষমতা অর্জন করতে পারছে না।

বর্তমানে শিক্ষা ও বিভিন্ন প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণের খরচ এত বেশি যে বহু মানুষ এই খরচ বহন করতে পারছে না।  তাই বহু মানুষই দারিদ্রতা ও বঞ্চনার শিকার। 

গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় দেশের সরকার শান্তি শৃঙ্খলা বজায় রাখার সাথে সাথে বহু রকম জনকল্যাণমুখী অর্থনৈতিক বিকাশ করে চলেছে। উৎপাদন বৃদ্ধি, পার্থিব স্বচ্ছন্দ্য, দারিদ্রতা নিরসনের চেষ্টা চলছে । বিশ্বায়নের ফলে আমাদের সংস্কৃতিতে যেমন বহু রকম পরিবর্তন চলেছে তেমনি সমাজে ঐতিহ্য আধুনিকতার  দ্বন্দ্ব বৃদ্ধি হচ্ছে। 

আধুনিক সমাজ বলতে যা বোঝায় তা আমাদের দেশে এখনও তৈরি হয়নি।  বেশীর ভাগ মানুষই দৈনন্দিন জীবনে প্রাচীন সামাজিক রীতিনীতি বর্জন করতে পারেনি । তাই পরিবার ও সমাজে বিদ্বেষ ও বিরোধ চলছে।  অপরদিকে রাজনৈতিক দলীয় সমর্থন মানুষে মানুষে ভেদাভেদ সৃষ্টি করছে।  সরকারী অনুদান নিয়ে যেমন মানুষে মানুষে লড়াই চলছে তেমনি অধিকারভেদ নিয়ে সমাজে হিংসা বাড়ছে । ঐতিহ্যের প্রতি বহু মানুষের বিশ্বাস ও মোহ আছে বলেই দেশের স্ত্রীলোকের অধিকার ভেদের শিকার হচ্ছে। পুরুষদের সমাজ রাজনৈতিক ও সামাজিক দেশের শাসনতন্ত্রে সর্বক্ষেত্রে স্ত্রীলোকের পুরুষদের সমান অধিকার বিভিন্ন ক্ষেত্রে হিংসা বৃদ্ধি করছে।  ভোগ্যদ্রব্য আধুনিকরণ মানুষের চিন্তার জগতে পরিবর্তন আনতে পারছে না । 

আধুনিক সমাজের জীবন দর্শন হচ্ছে ‘সাম্য’।  কিন্তু ঐতিহ্যরক্ষা করা বেশিরভাগ মানুষের কাম্য বলে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ও পরিবার স্থায়ী হচ্ছে। 

সমাজে মানুষ একাকী নয় । সমাজে বৈষম্য থাকা সত্ত্বেও মানুষ কোনো বা কোনোভাবে অন্য মানুষের সাথে যুক্ত।  বিভিন্ন রকমের নাগরিক প্রতিবাদ বা  আন্দোলন  মানুষের চিন্তার জগতে প্রশ্ন তুলছে ।বর্তমানে মানুষ   মানসিক দ্বন্দ্বে ক্ষতবিক্ষত।

দেশের দারিদ্রতা ও বেকারিত্ব পরিবারের মধ্যে বিভিন্ন সম্পর্কের ভাঙ্গন, নরনারীর যৌন সম্পর্কে টানাপোড়েন, বিভিন্ন রকমের ব্যর্থতা ও নৈরাশ্য মানুষের জীবনকে ক্ষতবিক্ষত করছে।  সমাজ সংকটের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে । নতুন দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে গণতান্ত্রিক সমাজ গড়ার স্বপ্ন মানুষ দেখছে। এই পরিবর্তনের চেষ্টা মানুষের মনকে নাড়া দিচ্ছে। কিন্তু মানুষ কোন সঠিক পথ খুঁজে পাচ্ছে না। মানুষ আজ বিভ্রান্ত/ উদভ্রান্ত।

বর্তমান সমাজে অধিকারভেদ দূর করে যে সমাজ গড়ার স্বপ্ন মানুষ দেখছে তার প্রতিফলন সাহিত্য হচ্ছে কি?  সামগ্রিক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশের মধ্যে সাহিত্যের জন্ম ও পুষ্টি  হলে  সাহিত্য যুগোপযোগী হয়।  সমাজের গণজীবন সাহিত্যের পলিমাটি। 

“জাতির  সাহিত্যই শুধু জানাইয়া দিতে সক্ষম সে জাতির চিন্তাধারা কোনদিকে কোথায় ও কতদূর গিয়া পৌঁছাইয়াছে। দর্শন বিজ্ঞান আয়ুর্বেদ এমনকি যুদ্ধবিদ্যার জ্ঞান ও চিন্তা দেশের সাহিত্যই প্রকাশ করে।”(চট্টোপাধ্যায়:২২০২)

বর্তমানে বহু মানুষ বিভিন্ন বিষয়ের ওপর লিখে যাচ্ছে ও নিজেদের চিন্তার প্রকাশ করছেন। দেশে এত বেশী লেখক/লেখিকার সংখ্যাবৃদ্ধি প্রমাণ করে যে মানুষ আত্মপ্রকাশ করতে ব্যাকুল। 

অনেক সময় ভাবের জোয়ার বিদেশী সাহিত্য থেকে আসে । যার ফলে দেশের বহু মানুষদের মধ্যে সাহিত্য সৃষ্টির উন্মাদনা সৃষ্টি হয় । কিন্তু যে ভাব বা চিন্তা দেশের মাটিতে জন্ম নেয় তা আস্তে আস্তে স্তিমিত হয়ে যায়। 

সাহিত্য মানুষ ও সমাজের কথা নানা ভাবে বলে । রাজনৈতিক সামাজিক ধর্মীয় সমস্যার সমাধান করা সাহিত্যের কাজ নয়। কিন্তু সাহিত্যের মধ্যে দিয়ে সমাজের বৈষম্য ও দ্বন্দ্ব গুলির সমাধানের পথ প্রদর্শন করা যায়। 

“পশুপক্ষীর চৈতন্য প্রধানত আপনার জীবিকার মধ্যে বদ্ধ- বর্তমান মানুষের চৈতন্য বিশ্বে মুক্তির পথ তৈরি করেছে, বিশ্বে প্রসারিত করেছে নিজেকে, সাহিত্য তার একটি বড়ো পথ।”(সাহিত্যের তাৎপর্য পৃষ্ঠা ৪৮৪,সাহিত্যের পথে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রবীন্দ্র রচনাবলী দ্বাদশ খন্ড বিশ্বভারতী, কলকাতা ১৭)।

বিজ্ঞানের উন্নতির সাথে সাথে সমাজ পরিবর্তনের ফলে মানুষের জীবনযাত্রার যে পরিবর্তন টিকে থাকার সংগ্রাম চিত্র সাহিত্য প্রতিফলিত হয়। কিন্তু “সমাজের বা পরিপার্শ্বের নির্ভূল প্রতিচ্ছবির এক টানা বর্ণহীন বৈচিত্রহীন প্রবাহ নয় সাহিত্য’( “মেহনত ও প্রতিভা” পৃষ্ঠা ১৯ বিনয় ঘোষ।)

যুগের চিন্তাধারা ও বিতর্ক প্রকাশের জন্য চাই উচ্চ মানের গদ্য সাহিত্য । সাহিত্য পৃথিবীর মানুষের কথাই নানাভাবে বলে । সাহিত্য দ্বারা সমাজে নতুন প্রাণশক্তি ও বিশ্বাস জাগরিত হয়।


গ্রন্থপঞ্জী:

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, ‘মাতৃভাষা ও সাহিত্য’, শরৎ সাহিত্য সমগ্র অখণ্ড সংস্করণ, সম্পাদক  সুকুমার সেন, আনন্দবাজার পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড কলকাতা ।


১০/০২/২৬



Comments