কুন্তীর আত্মকথা ( 3)
Chapter 3
তখন আর আমি হস্তিনাপুরের রাণী নই । নতুন জীবনে আমি আর মাদ্রী অভ্যস্ত হতে আরম্ভ করলাম। আমাদের আহার ফল মূল আর বসন বল্কল চর্ম । বিভিন্ন ঋষিদের আশ্রম ঘুরে তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ, আলাপ আলোচনায় পান্ডুর দিন কাটে। ধ্যান তপস্যা হোম যজ্ঞ এই আমাদের অহরহ ক্রিয়া।
প্রকৃতির অপূর্ব সৌন্দর্যে একাকিত্ব থাকে না। নাগ শত চৈত্ররথ কালকূট গন্ধমাদন পর্বত ও ইন্দ্রদ্যুম্ন সরোবর এমন কি হংসকূট পেরিয়ে আমরা একদিন এলাম শতশৃঙ্গ পর্বতে। শতশৃঙ্গ পর্বত মনুষ্য বসবাসের শেষ খুঁটি। এর পরে শুরু হয় উত্তরকুরু এবং দেবতাদের বিচরণের স্থান।
একদিন পান্ডু শুনলেন ঋষিরা ব্রহ্মলোকে যাওয়ার প্রস্তুতি করছেন।
‘আপনার স্ত্রীরা এই দুর্গম পর্বত পথ অতিক্রম করতে পারবে না। আপনি বরং ব্রহ্মদেশ যাবার ইচ্ছা ত্যাগ করুন’ ঋষিরা বারবারই পান্ডুকে বারণ করতে লাগলেন। কিন্তু তার আসল কারণ পান্ডু পিতৃঋণ থেকে মুক্ত নয় কারণ তার পুত্র সন্তান নেই।
আবার পান্ডুর মধ্যে হতাশা এল একদিন আমাকে পান্ডু খুলে বললেন তার ক্ষেত্রেজ সন্তানের প্রয়োজনের কথা।
'না মহারাজ আমি আপনি ব্যতীত অন্য কোন পুরুষকে আমাকে ছুঁতেও অবধি দেব না , তা কখনও সম্ভব নয় ।’ এই আমার উত্তর ছিল।
এই বলে পান্ডু নানান উদাহরণ দিতে আরম্ভ করলেন । একটি কথা, ‘আমার সমতুল্য বা আমার থেকে শ্রেষ্ঠ যথার্থ কোন ব্রাহ্মণের সঙ্গে সন্তান উৎপাদন হোক এই আমার প্রার্থনা।’
‘আমিও মহারাজ ব্যুষিতাশ্বর রাণী ভদ্রার উদাহরণ দিতে পারি যে স্বামীর মৃত্যুর পর যোগবলে মৃতপতির সঙ্গে মিলনে গর্ভধারিণী হয়েছিলেন।’
পান্ডু বললেন, ‘কুন্তী কিন্তু আমি ধর্মতত্ত্বের কথা বলছি। শাস্ত্রে ছয় ধরনের পুত্র সন্তান বলা আছে । তাদের মধ্যে ছয় ধরনের যারা আত্মীয় এবং উত্তরাধিকারী এবং বাকি ছয় ধরণের তারা শুধু আত্মীয় । প্রথমত ঔরস সন্তান, তারপরে ক্ষেত্রজ সন্তান এমনকি এর মধ্যে কানী ন সন্তান ও সেই কন্যার স্বামীর উত্তরাধিকারী।’
আমি কিছু উত্তর দিলাম না ধর্ম অনুসারে কানী ন সন্তান সিদ্ধ কিন্তু সমাজের নিয়ম এখন কঠিন। সত্যবতীও শান্তনু জীবিত থাকাকালীন দ্বৈপায়নকে স্বীকার করেনি । এর পূর্বেই আমি বলেছি আমি মহারাজ ব্যতীত কারকে আমাকে ছুঁতে দেব না এর পরবর্তী আমি বলব যে আমার কানী ন সন্তান আছে? মাদ্রী গান্ধারী এদের সতীত্বের কাছে কি আমি ছোট হয়ে যাব? আর তাছাড়া যে পুত্র এখন অন্য জায়গায় পালিত হচ্ছে তাকে হঠাৎ করে স্বীকার করাটা আমার তখন কোনো দিক থেকেই শ্রেয় মনে হয়নি।
তাই আবার সেই একই কথা বললাম আর আমি আপনার স্ত্রী পান্ডু আপনি আমার কাছে শ্রেষ্ঠ পুরুষ তাই আমি অন্য কোন পুরুষকে গ্রহণ করব কেন?
‘এই নিয়ম চিরকাল ছিল না কুন্তী,’ পান্ডু বললেন।
‘এই নিয়ম এনেছিলেন শ্বেতকেতু। শ্বেতকেতু দেখেছিলেন যে তার পিতার সামনে তার মাতাকে এক পর ব্রাহ্মণ পুরুষ ধরে নিয়ে যাচ্ছে। তখন শ্বেতকেতু জিজ্ঞাসা করলে তার পিতা উত্তর দিয়েছিলেন যে নারীরা স্বাধীন। তখন শ্বেতকেতু এই বিধান দেন , যে নারী পরপুরুষগামী হবে, যে পুরুষ প্রতিব্রতা পত্নীকে ত্যাগ করবে এবং যে নারী তার পতির আজ্ঞা সত্বেও ক্ষেত্রজ পুত্র উৎপাদন করবে না তাদের ভ্রূণ হত্যার পাপ হবে।’
‘শোনো পৃথা আমার জন্মও এই ভাবেই হয়েছে। রাজা বিচিত্রবীর্যের ক্ষেত্রে আমার মাতা অম্বালিকার গর্ভে কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন নিয়োগিন ছিলেন। আমি প্রার্থনা করছি তুমি আমায় পুত্র সন্তান দাও।’
তখন পান্ডুকে জানালাম ঋষি দূর্বাসার বর প্রাপ্ত মন্ত্রের কথা। দেবতা বা ব্রাহ্মণ দুই আহ্বান করতে পারি। পান্ডু কে জিজ্ঞাসা করলাম কাকে আহ্বান করব । পান্ডু উত্তর দিলেন, ‘প্রথমে ধর্মকে আহবান কর।’
শতশৃঙ্গে পান্ডুর প্রার্থনায় তিন ক্ষেত্রজ সন্তানের জন্ম হল । আমার প্রথম সন্তান যুধিষ্ঠির, দ্বিতীয় সন্তান ভীম এবং তৃতীয় সন্তান অর্জুন। মাদ্রিকেও সেই মন্ত্র আমি দিয়েছিলাম। মাদ্রীর যমজ পুত্র হয়েছিল নকুল ও সহদেব । এই ভাবে সময় কেটে গেল । এও শুনেছিলাম হস্তিনাপুরে গান্ধারীর একশো পুত্র সন্তান ও এক কন্যা হয়েছে।
আমার পুত্ররা বড় হতে আরম্ভ করল । যুধিষ্ঠির যেহেতু জ্যেষ্ঠ হস্তিনাপুরের ভবিষ্যৎ যুবরাজ হবে , অর্জুন শ্রেষ্ঠ যোদ্ধা ও ভীম শক্তিশালী। এটা সত্যি যে পান্ডু প্রথমে যুধিষ্ঠিরের জন্ম চেয়েছিল তার পরলৌকিক ক্রিয়ার জন্য। কিন্তু তারপরে ভীম অর্জুনের এবং মাদ্রীর পুত্রদের জন্মের পর হস্তিনাপুর শতশৃঙ্গে আবার প্রজ্জ্বলিত হয়ে এসেছিল। হস্তিনাপুর ও শতশৃঙ্গের হয়ত অনেকটা দূরত্ব থাকতে পারে কিন্তু মানসিকভাবে আমাদের সঙ্গে আর হস্তিনাপুরের কোন দূরত্ব আর ছিল না। হস্তিনাপুর আর কতই বা দূরে ? কিন্তু তবুও কি বাধা ছিল পান্ডুর সেখানে ফেরত যাওয়ার একমাত্র তো ঋষি কিমিন্দমের অভিশাপ। পাঁচ পুত্রের রূপে গুণে তাদের ভবিষ্যৎ কল্পনায় যেন সেই অভিশাপ মিথ্যা লাগছিল। পান্ডুর কাছে হয়ত আরও বেশি মিথ্যে লাগছিল।
আর তারপরই অকস্মাৎ এক বসন্তের দিনে মাদ্রীর চিৎকার আমাকে জীবনের শেষ প্রান্তে নিয়ে এসেছিল, তখন পুত্রদের নিয়ে আমার জীবনে বিপর্যয় এল। বুঝতে পেরেছিলাম কি হয়েছে। অনুরাগ মৃত্যু রূপে এসেছিল ঋষি কিমিন্দমের অভিশাপ সত্যি করতে । মাদ্রীর সঙ্গে সঙ্গম করতে পান্ডুর মৃত্যু হয়েছে ।
সেই দিন সোজাসুজি মাদ্রীকে দোষারোপ করেছিলাম।
‘কেন হতচ্ছারী? আমি যে সংসার তৈরি করেছিলাম সব নষ্ট করে দিলি তোর কি আমার সুখ সহ্য হয় না?’
‘বিশ্বাস কর দিদি আমি অনেক বারণ করেছিলাম কিন্তু উনি আমার না গ্রাহ্য করেননি।’
তখন একটাই কথা বললাম ‘ মাদ্রী তুই ভাগ্যবতী কারণ অন্তত পান্ডুর চোখে প্রেম দেখতে পেরেছিস যা আমি কোনদিনই পাইনি।’ যদিও আমি পান্ডুকে তিন সন্তান দিয়েছি কিন্তু কোন দিন পায়নি সেই পরিপূর্ণতা যা এক স্ত্রীর প্রাপ্য। মাদ্রীকে দোষারোপ করেছিলাম ঠিকই কিন্তু পরে বুঝেছিলাম যে আমি পরাজিত হয়েছি।
‘আমার পুত্রদের তুমি নিজের সন্তান থেকে আলাদা করে কোনোদিন দেখবে না দিদি । আর আমার পুত্ররাও আমার থেকে বেশি তোমাকে তাদের মাতা বলেই মনে করে । তাই আমাকে পরলোকে গমন করার জন্য আজ্ঞা দাও দিদি।’
মাদ্রী নিজেকে পান্ডুর মৃত্যুর জন্য দায়ী মনে করে পরলোকে পান্ডুর কামনা পূর্ণ করার জন্য প্রাণত্যাগ করল । আর আমি ইহলোকে পান্ডুর ইচ্ছাপূর্ণ করার জন্য পুত্রদের নিয়ে হস্তিনাপুর এ রওনা হওয়ার প্রস্তুতি শুরু করলাম।
ক্রমশ
Comments
Post a Comment