সুপ্রিয়া রায় মল্লিক : আমার দুই মাসী
১৯৪৭ সালে আমার বড়মামীর আমাদের পরিবারে প্রবেশ । অপূর্ব সুন্দরী, বিদুষী, মিতভাষী, সংস্কৃতির শেষ কথা ছিলেন চিত্রা মিত্র । উচ্চমার্গে থাকতেন, না অহঙ্কারী ছিলেন না, লাজুক ছিলেন। এক অতি সুন্দর ঘটনা আমাদের চোখের সামনে ঘটলো এই দুই অসম ব্যাক্তিত্বের এক অপূর্ব বন্ধুত্ব হলো । মাসু ডাকতেন 'বৌঠান' আর মামী ডাকতেন ' বুট্টু' বলে। চর্তুদিকে যেখানে ননদ ভাজের অমিল, মনোমালিন্য, হিংসায় বেশীর ভাগ সংসার ভরে যায়, সেখানে এরা দুজনে অভিন্নহৃদয় বন্ধু ছিলেন জীবনের শেষ দিন অবধি। আমি দুজনের কাছে কৃতজ্ঞ ।
মাসুর কাছে শিখেছি কি করে সংসারের স্থূল কাজ হাসিমুখে করতে হয় । খাওয়া হয়ে গেলে কি করে যে টুকু বাঁচবে সেটা কি করে গুছিয়ে তুলতে হয় । কি রকম করে গরম কাপড় রোদে দিতে হয়। মিস্ত্রীর কাজ কি ভাবে দেখতে হয়। সব খরচের হিসাব রাখতে হয়। আমরা দুজনে এক সঙ্গে কত পর্দা সেলাই করেছি। আজ ও আমি বাড়ীর পর্দা নিজেই করেনি। বড়মামীর কাছে শিখলাম সাহিত্যকে ভালবাসতে, যে সাহিত্য চর্চা আমার জীবনের সব, আমার অবলম্বন । আমার নীরব নির্জন মুহুর্তের সঙ্গী । একাকীত্বর সঙ্গে লড়াই করার অস্ত্র । খালি গান শেখাতে পারলেন না। ওখানে আমি শূণ্য পেলাম।
আমার বাবা কৃষ্ণনগর, বহরমপুরে থাকতেন বলে মা আমাকে কোন সময়ে গিরিডিতে দিদিমার কাছে, কোন সময়ে বড়মামীর কাছে, কোন সময়ে মাসুর কাছে রাখতেন। আমার কখনও মনে হয় নি আমি অন্য বাড়িতে আছি। সে এক যুগ ছিল, আত্মীয়দের সঙ্গে কি সুন্দর সম্পর্ক ছিল।
পঞ্চাশের দশকে মায়েরা চার ভাই বোন নিউ আলিপুরে বাড়ি করলেন। সব থেকে আগে ছোটমামার বাড়ি হল, মাসীর বাড়ী প্রথমে নীচে দুটো ঘর, আস্তে আস্তে বাকিটা, আমাদের বাড়ির সামনে। একটু দূরে বড়মামার বাড়ী, সব একই ব্লকে। সবাইকার কি আনন্দ, রোজ দেখা হওয়া অনেক সহজ হয়ে গেল। মাসুর বাড়ির এক তলা ভাড়া দেওয়া হল। ওপরে একটি বড় ঘর। সুখস্মৃতি । সেই ঘরে মাসু, পুপু, Happy আর আমি। একটি দৃশ্য মনে আছে, মাসু অতি দক্ষতার সঙ্গে মিস্ত্রীদের কাজ দেখতেন আর প্রায়শই বাইরে যে বাঁশের ভাড়া থাকতো তাতে উঠে যেতেন। একদিন আমার বাবা সেই দৃশ্য দেখেন আর কি বকুনি।
মাসুর ধৈর্য্য পরীক্ষা শেষ, দোতালা পুরো তৈরী। মণি মামা ও রিটায়ার করে চলে আসলেন। ভালোবাসার বারান্দাতে রোজ সবাই বসতেন, চা আর নিছক আড্ডা। মা, বড়মামী, মাঝে মাঝে ছোটমামা আর ছোটমামি। । মাসুর আর মণিমামার সঙ্গে আমাদের ও আড্ডা দিতে অসম্ভব ভাল লাগতো । মাসীর হাতে গোনা কয়েক জন বন্ধু ছিল, পাড়ায় খুব একটা মিশতেন না । আমার মনে হয় মাসী নিজের সংসার আর স্বামীকে নিয়ে এত খুশি ছিলেন যে বর্হিজগতে আনন্দ খোঁজার প্রয়োজন মনে করতেন না।
ছোট বেলায় আমি খুবই বাধ্য মেয়ে ছিলাম। এখন আমার রণ রঙ্গিণী মুর্তি দেখলে কেউ বিশ্বাস করবে না। কিছুদিন আগে আমাকে ' female wrestler' বলেছিলেন এক বিখ্যাত লেখক, বুদ্ধদেব গুহ, মজা করে । আমার স্বামীর কলেজের বন্ধু, আমার মামাতো বোনের ভাসুর। বলেছিলেন " আমাদের একটু নরম প্রকৃতির মেয়েদের ভালো লাগে, তোমাদের মত female wrestler থেকে দূরে থাকি। " ওনার স্বভাবসিদ্ধ রসিকতা তে। আমি আবার ওনার মেয়ের শিক্ষিকা ছিলাম ।কি করবো ? আমাদের চলার পথ তো খুব সুগম নয়। সারাজীবন ত খালি সংগ্রাম, আরো সংগ্রাম।
ছোটবেলাতে মা আমাকে নিয়ে সব জায়গাতে যেতেন। আত্মীয়দের বাড়ী যাওয়া জীবনযাত্রার অঙ্গ ছিল। সব বাড়িতে যেতে ভালো লাগতো না। কিন্তু কমল মাসীর বাড়ী যেতে আনন্দে মন ভরে যেত। মায়ের জ্যাঠতুতো দিদি। কিনতু খুব সন্তর্পণে কথা বলতে হতো। ঐ অল্প বয়সে বুঝতে পারতাম মাদের " দিদি" head of the family. আমার মাকে সবাই ভয় পেতো, কিন্তু সেই মা 'দিদি'কে বেশ ভয় পেতেন।
আজকে ওনার নাতনি আমাকে অনুরোধ করেছে ওর দিদিমার বিষয় লিখতে। চোখের সামনে কত দৃশ্য ভেসে উঠছে। দক্ষিণ কলিকাতাতে বাড়ি ছিল। কিন্ত একটু গলির মধ্যে তাই বড় রাস্তায় নেমে হাঁটতে হতো। দেখতাম কমল মাসী এক ছোট স্টোভে কি রাঁধছেন। স্বপাক রান্না । সাদা শাড়ি, ফর্সা রং থেকে ঘাম ঝরছে । বেশ কড়া গলায় সবাই এর খোঁজ খবর নিতেন। গীতুদি, খুকুদি, দেবুদা কিন্তু খুব মিষ্টভাষী ছিলেন। ওনার সন্তান।
এখন ভাবি কেন এত কঠিন জীবনযাত্রা বেছে নিয়েছিলেন ? কেউত বলার ছিল না। কিন্তু সেই স্টোভে রান্না করা নিরামিষ তরকারির কি অপুর্ব স্বাদ। আজও মনে আছে। যে দিন আমাদের বাড়িতে আসতেন, সেদিন মা কে বেশ ভীত দেখতাম। কিন্তু কিছু খেতেন না। একজন সাদা থান পড়া মানুষ, অতি মধ্যবিত্ত তার কি দাপট, উনি যেটা বলবেন সেটাই শেষ কথা। এখনকার প্রজম্ম এসব কল্পনা করতে পারে না।
আমরা ব্রাহ্ম সুতরাং আমরা হিন্দু বিয়ের অনেক নিয়ম কানুন জানি না। তারপরে আবার মা convent এ পড়েছেন। কিছুই জানেন না কিন্তু শখ হলো আমার বিয়ের সময় সব নিয়ম মেনে জামাই বরণ করবেন। দিদি"র শরণাপন্ন হলেন, তিনি প্রথমে রাজী হননি। বিধবা মানুষের নাকি শুভ কাজে থাকতে হয় না। মায়ের অনুরোধে রাজী হলেন, দূর থেকে বলে দেবেন। সে এক দৃশ্য, এক এক ধাপ এগুচ্ছে আর মা করুণ গলায় বলছেন " দিদি, এবারে কি কুলোটা মাথায় ঠেকাবো ?" বেচারা আমার বর মুখে হাসি নিয়ে এসব সহ্য করলো । সে আবার ঘোরতর ব্রাহ্ম । Diocesan আর Gokhale তে পড়া মা বলছেন " দিদি, what next?" আর দিদির ( কমল মাসীর) হুন্কার । " মন দিয়ে বরণ কর "। প্রতিটি পদ বলে দিচ্ছেন। আহা, এ দৃশ্যের যদি video করা যেতো ?
ভামরীমামা মানে ডাক্তার কৃপা মিত্রের দিদি। উনি ও দিদির কথা শুনতেন? আমি ভাবি কিসের জোরে এত দাপট ছিল!!! আর আশ্চর্য জ্যাঠতুতো, পিশতুত দিদি সব মনে হতো এক পরিবারের, পুঁটুমাসি ছিলেন "'মেজদিদি"। কি কারণে এক বস্ত্রে বড়লোক স্বামীর ঘর ছেড়ে চলে এসেছিলেন। বিভিন্ন বাড়িতে ঘুরে ঘুরে থাকতেন। কিন্তু কেউ খোঁটা দিতো না। যেন এটাই ধর্ম। তিনি আশ্রিতার অবমাননা পান নি। তারও অধিকার ছিল আমাদের শাসন করার।
এই প্রগতিশীল জগতে কে কোথায় হারিয়ে গেছে কিন্তু ফেসবুকের দৌলতে অনেকের সঙ্গে যোগাযোগ হচ্ছে। তাই কমল মাসির নাতনির অনুরোধে ওর দিদিমার একটি অসামান্য গল্প দিয়ে শেষ করি। ১৯৩৬ সাল, ৩৬ বছর বয়সে বাবা ঠিক করলেন বিয়ে করবেন। বাবার সাজগোজ অতি সাধারণ ছিল। তাই 'বিয়ের বর 'সিল্কের পাঞ্জাবি পরেন নি, কপালে চন্দন পরেন নি। বরযাত্রির মধ্যে অনেকেই সিল্কের পাঞ্জাবি পড়েছিলেন ,আর কপালে চন্দন। বাবার এক বন্ধু হরি পদ মৈত্র , অতি সুপুরুষ, সিল্কের পাঞ্জাবি আর কপালে চন্দন পরে বাবার পাশাপাশি এসেছেন। গেটে কমল মাসি ( তখন সধবা) বরণ করার জন্য তৈরী। বাবাকে দেখে মনে হয় নি " বর" বলে । তাই সিল্কের পাঞ্জাবি কে ধরলেন । প্রথমেই বকুনি দিলেন দেরী করে আসার জন্য। তারপর ওকেই বরণ করতে শুরু করেন। তিনি ত করযোড়ে বলছেন " আমি বর নই, উনি বর" কমলমাসি বাবার চেহারা দেখে বিশ্বাস করলেন না হুন্কার দিলেন" বিয়ে করতে এসে ফাজলামি হচ্ছে , চলো কাপড় বদলাবে" বাবা দূরে দাঁড়িয়ে মজা দেখছেন। হরিপদ কাকা কাতর গলায় বলছেন, " আমাকে ছেড়ে দিন' । আর কোন সময় নষ্ট না করে এক থাপ্পড় কমল মাসির কোমল হাতের। " ঠাট্টা হচ্ছে ?" গল্প হলেও সত্যি । তারপর কনের বাড়ি থেকে মায়েদের কাকা চানু মিত্র বাবাকে চিনতেন। উনি এসে বাবাকে সণাক্ত করেন , বলেন, " দেবব্রত, অনেক হয়েছে, এবার বিয়ে করতে যাও ।'
ঘরে ঘরে যেন কমল মাসির মত মহিলা থাকেন যাকে সবাই সমীহ করবে। রাধারানী তুই খুশি তো? দিদিমার গল্প শুনে। সুপুমাসী I
Comments
Post a Comment