কবিতাগুচ্ছ / বিপ্লব ঘোষ (2)
সেই গল্প বলো
আমি পাথর ভেঙে রাস্ত গড়েছি
আমায় রাস্তার গল্প বলো না।
আমি সমুদ্র পেরিয়ে ওপারে গিয়েছি
আমায় জোয়ার ভাটার গল্প বলো না।
আমি আগ্নেয়গিরির পাশে থেকেছি
আমায় আগুনের গল্প বলো না।
আমি চোখের সামনে অবেলায় যেতে দেখেছি
আমায় মৃত্যুর গল্প বলো না।
আমাকে কী করে সন্ধ্যা নামে গোঠে
তার গল্প বলো।
আমাকে রাতের আঁধারে কেমন করে ফুল ফোটে
তার গল্প বলো।
আমাকে হাজার মাইল পথ চিনে পাখিগুলি আসে
তার গল্প বলো।
আমাকে শুঁয়োপোকার থেকে প্রজাপতি ভাসে
তার গল্প বলো।
-----------------
আমাকে বলতে বলো না
আমার সেসব মনে আছে কিনা
প্রথম নদীকে দেখার দিন
প্রিয়ার মুখের সেই ছবি
যা দেখে নৌকোডুবি হয়েছিল।
আমার সেসব কি আর মনে আছে !
ফরিং ধরে সুতোয় বেঁধেছিলাম
স্কুলে যাওয়ার প্রথম দিন
এমনকি বাবার বাড়িতে কবে এসেছিলাম !
অনেক করেও পাহাড় জঙ্গল
মনে পড়ে না,মনেই পড়ে না।
অথচ প্রতিটি মৃত্যু শোক
দাউ দাউ করে জ্বলছে
মানুষ হলো সেই হাঁস
সে দুধের মতো
দুঃখ যন্ত্রণা নিয়ে
জল রেখে যায় যত।
মৃত্যুর মতো অসুখ আমার
এত শোক পেরিয়ে কোথায় মুক্তি পাবো
ঘরের যত যা আছে দিয়েছি সরিয়ে
সেই বিছানা, দেয়ালের রং পাল্টিয়ে
ভেবেছিলাম, এবার বুঝি বেঁচে যাবো।
বহুকাল হল তুই আর ঘরে নেই
লোকে বলে যেখানে আছে ভাল থাকুক
তুই আছিস ,আমার সঙ্গেই বাঁচুক।
----------
এমন ছিল না চৈত্রের বিকেল
অন্ধের বেলা অবেলা
ভোরের বাতাস ছিল সুমধুর
শুধু সুখের খেলা।
মাঝি আর আসে না ঘাটে
তরীতে জাগে না ঢেউ
ধানের ক্ষেতে কাঁদে একলা চাষী
রাতের ট্রেনে যায় কেউ।
কে আর জানিত একদিন
শ্রাবণের মেঘে ব্যথিত তারা
ঝরে যায় কোন সুদূরে
নীরবে পথ হারা ।
কে আর জানিত একদিন
গোঠের রাখাল আর বাজাবে না বাঁশি
ফেলে আসা জানলার ফাঁকে
ডানা মেলে চিল দেখবে না আমাকে ।
এমন ছিল না চৈত্রের বিকেল
অন্ধের বেলা অবেলা
ভোরের বাতাস ছিল সুমধুর
শুধু সুখের খেলা।
বিপ্লব ঘোষের জন্ম ২৩ ফেব্রুয়ারি,১৯৫৩ কলকাতায়।.বাণিজ্যে স্নাতক। ওষুধ নির্মাণ সংস্থার ম্যানেজিং ডিরেক্টর ছিলেন কুড়ি বছর। কবিতা উপন্যাস মিলিয়ে পনেরটি বই প্রকাশিত। উৎসব সম্মান ২০০৪ (আমেরিকা),জন্মদিন ও সুধীন্দ্রনাথ দত্ত স্মৃতি পুরস্কার এবং শ্রেষ্ঠ নাগরিক সম্মান পেয়েছেন জার্নালিস্ট এসোসিয়েশন অব বেঙ্গল-এর পক্ষ থেকে।এছাড়া নিজের লেখা নিয়ে দুটো শর্ট ফিল্ম। কবির জীবন এক মহাশোকের।প্রথম স্ত্রী মারা যান ক্যান্সারে। ২০০১ বকখালির সমুদ্রে ডুবে যায় চোখের সামনে উনিশ বছরের ছেলে সানি। তার স্মৃতিতে একটি কিন্ডারগার্টন স্কুল করেছেন নিজের বাড়িতে ২০০৪-এ।বড় মেয়ে ২০২০- তে এক বিরল অসুখে চলে গেছে পৃথিবী ছেড়ে। তবু তিনি নীরবে সৃষ্টিতে মগ্ন থাকেন। দেখে মনে হয় সন্ন্যাসী রাজা।ভিতরের রক্তক্ষরণ বুঝতে দেন না।বহু গানের গীতিকার ও সুরকার। বিদেশের পত্র পত্রিকায় নিয়মিত লেখেন। প্রকৃতির টানে বেড়িয়ে পড়েন।নদী তার প্রিয়। বর্তমানে স্ত্রী ও ছোট মেয়ে নিয়ে নিজেদের বাগানঘেরা বাড়ি কলকাতার কেষ্টপুরে থাকেন।




Comments
Post a Comment