শ্রীমতি ইরাবতীর ধারাবাহিক গল্প কুন্তীর আত্মকথা (2)
Chapter 2
ধাত্রীমা থেকে জানতে পেরেছিলাম আমার পুত্র পালিত হচ্ছে অধিরথ নামক এক সুত সারথির ঘরে । আর আমার পুত্রের সেই ভাগ্যবতী মাতা এখন অধিরথ পত্নী রাধা।
এরপর এক বৎসর কেটে গিয়েছিল। এদিকে অনেক রাজা আমার সঙ্গে বিবাহ অভিলাসে পূর্বে দূত পাঠিয়েছেন। তাই কুন্তিভোজ আমার বিবাহের জন্য স্থির করলেন এক স্বয়ংবর সভা ঘোষণা করবেন। কুন্তিভোজ সকল রাজা, রাজপুত্র ও ভূপতিদের আমন্ত্রণ পাঠালেন এবং সকলেই আমন্ত্রণ গ্রহণ করলে । কুন্তিভোজ তাতে আনন্দিত ও উদ্বেগ মুক্ত হলেন।
‘শোনো পৃথা,’ কুন্তিভোজের জ্যেষ্ঠা স্ত্রী সেই নামেই আমাকে ডাকতেন । ‘তাড়াহুড়ো কর না। যখন নিজের ভাগ্য নিজে স্থির করার সুযোগ পেয়েছ।’
আবার কনিষ্ঠা রাণী বললেন, ‘দিদি কুন্তী সুন্দরী হতে পারে তবে পুরুষদের মধ্যে উন্মাদনা সৃষ্টি করার ক্ষমতা ওর নেই। ওর জন্য কোনও যুদ্ধ লাগবে না। এত চিন্তা কর না।’
‘সেটা যদি হয় সেটা কুন্তীর দোষ নয় আর অম্বার মত বীর্যশুল্ক হওয়ার থেকে এ ঢের ভাল । তবে কুন্তী মনে রেখো ক্ষত্রিয়দের অহংকার কোনওদিন লেলিয়ে দিও না কারণ তাতে বিপদ তোমার হবে ।’
অম্বার বীর্যশুল্ক এক দীর্ঘ কাহিনী তবে সংক্ষেপে এটাই বলার যে বীর্যশুল্ক অর্থাৎ কন্যাকে হরণ করে সকল ক্ষত্রিয়কে পরাজিত করে বিবাহ করা।
সেই দিন ফুলের গন্ধ সিক্ত জলে স্নান করার পর সৈরেন্ধ্রীরা আমার কেশ নানা সজ্জায় সজ্জিত করেছিল। সোনার সুতোয় কাজকরা বস্ত্র ও নানা বিধ অলংকারে সজ্জিত হয়ে তখন স্বয়ংবরের জন্য প্রস্তুত হলাম তখন আমার সখীরা হাসতে হাসতে জানল, ‘ভোজকন্যা আপনাকে তো শচী দেবীর মতো লাগছে, সব রাজারাই এসেছেন, কিছু কি ভেবেছ পৃথা না কি স্বয়ং দেবরাজ ইন্দ্রের অপেক্ষা করবে ?’
সেই দিন আমার জন্মদাতা পিতা শূরসেন ও ভ্রাতা বাসুদেবও এসেছিলেন। হাতে বরমাল্য নিয়ে যখন প্রবেশ করলাম কুন্তিভোজ আমার গুণাবলির মধ্যে দুর্বাসার মত ঋষিকে সেবা করার উল্লেখ করতে ভুললেন না । তারপর আমার ভ্রাতা অর্থাৎ পুরুজিৎ এবং বাসুদেব যথারীতি একে একে সকল আমন্ত্রিতদের নাম ঘোষণা করতে আরম্ভ করলেন।
একে একে নাম ঘোষণার পর পুরুজিৎ হঠাৎ বলল, ‘আর কুন্তী তোমার জন্য এসেছেন বিচিত্রবীর্য পুত্র , বীর ধনুরর্বীর , হস্তিনাপুর নরেশ পাণ্ডু ।’ এটি সম্ভবত পান্ডুর প্রথম স্বয়ংবর তিনি অবিবাহিত তাহলে আমি হব পান্ডুর জ্যেষ্ঠা স্ত্রী ও হস্তিনাপুরের রাণী। মনে মনে আগেই স্থির করেছিলাম যে কোন পূর্ব বিবাহিত রাজা, রাজপুত্র বা ভূপতির গলায় মাল্যদান করে দ্বিতীয় পত্নী হব না।
কিন্তু তখন পাণ্ডুর শরীরের প্রভা, প্রশস্ত বক্ষ যেন স্বর্গের দেবরাজের মত সকল ভূপতিগণকে আচ্ছাদন করে আমাকে আকর্ষিত করছিল যেন স্বয়ং ইন্দ্র আমার প্রেমে মগ্ন হয়ে সভায় উপস্থিত হয়েছেন । ক্ষত্রিয়দের অহংকার লেলিয়ে কাজ নেই। আমি সময় নষ্ট করলাম না। ভাগ্য যদি আমাকে হস্তিনাপুরের রাণী করে যদি পান্ডুর মত বীর স্বামী দেয় তবে দেরি কিসের? বরমাল্য হাতে সকলকে এড়িয়ে পান্ডুর দিকে এগিয়ে গেলাম । আর পাণ্ডু সলজ্জিত হাসি হেসে উঠে দাঁড়ালেন মাথা নত করে আমার বরমাল্য গ্রহণ করলেন । ভোজরাজ্যে আমার ও পান্ডু বিবাহ সম্পন্ন হল। কুন্তিভোজ বিবাহ যৌতুক দিয়ে আমাকে পান্ডুর সঙ্গে হস্তিনাপুরে পাঠালেন ।
পান্ডুর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা ধৃতরাষ্ট্র অন্ধ ছিলেন । তাই পাণ্ডুকে রাজা ঘোষণা করা হয়েছিল। হাস্তিনাপুরে নতুন রাণীর সম্বর্ধনা প্রস্তুতি শুরু হয়ে গিয়েছিল। পান্ডুর নামে ‘মহারাজ পান্ডুর জয়!’ ঘন ঘন জয়ধ্বনি শোনা যাচ্ছিল। প্রাসাদের দ্বারে এসেছিলেন সত্যবতী, ভীষ্ম, গান্ধারী ধৃতরাষ্ট্র ও মহামন্ত্রী বিদুর। তারপর আমাকে নিজের রাণী হিসেবে পান্ডু প্রতিষ্ঠিত করলেন। আমি হলাম হস্তিনাপুরের রাণী।
হস্তিনাপুরের রাজা শান্তনুর প্রথম স্ত্রী গঙ্গা ।গঙ্গার দ্বারা শান্তনুর একমাত্র সন্তান গঙ্গাপুত্র দেবব্রত ছিলেন যুবরাজ ও রাজ্যের উত্তরাধিকারী । রাজা শান্তনু একবার বনে মৃগয়া করতে গিয়ে পদ্ম ফুলের সুগন্ধ অনুসরণ করতে গিয়ে মৎস্যগন্ধার সঙ্গে পরিচিত হন । যখন রাজা শান্তনু দ্বিতীয় বার মৎস্যগন্ধাকে বিবাহ করবেন বলে স্থির করেন তখন পিতার জন্য দেবব্রত তার রাজ্যাধিকার ত্যাগ করেন । শুধু তাই নয় প্রতিজ্ঞা করেছিলেন তিনি কোনকালে বিবাহ করবেন না, আজীবন ব্রহ্মচর্য পালন করবেন। তাই এই ভীষণ প্রতিজ্ঞার জন্যে তার নাম হল ভীষ্ম ।
রাজা শান্তনু বিবাহ পূর্বে সত্যবতীর নাম ছিল মৎস্যগন্ধা। একবার ঋষি পরাশর নদী পারে মৎস্যগন্ধাকে দেখে আকর্ষিত হন এবং এক পুত্র প্রার্থনা করেন । সেই পুত্র কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন ব্যাস। এই ঋষি পরাশরই মৎস্যগন্ধাকে বর দিয়েছিলেন যে মাছের দুর্গন্ধ পরিবর্তে পদ্ম ফুলের সুগন্ধ তার শরীর থেকে বের হবে । সে হবে যোজনগন্ধা।
মহারাজ শান্তনু সত্যবতীকে বিবাহ করেন। তাদের দুই পুত্র চিত্রাঙ্গদ ও বিচিত্রবীর্য ।কিন্তু শান্তনুর মৃত্যু পরবর্তী এরা দুজনেও বেশিদিন সিংহাসন দখল করতে পারেননি। তারা দুজনেই খুব স্বল্প বয়সেই পরলোক গমন করেন । তখন সত্যবতী তার কানী ন পুত্র ঋষি ব্যাস দ্বারা নিয়োগ প্রথা অনুযায়ী নিজের স্বামীর বংশ রক্ষা করেন। ঋষি ব্যাস দ্বারা দ্বিতীয় পুত্র বিচিত্রবীর্যের দুই বিধবা স্ত্রী অম্বিকা, অম্বালিকা এবং অম্বিকার দাসীর গর্ভে তিন ক্ষেত্রজ সন্তান হয়েছিল ধৃতরাষ্ট্র, পান্ডু ও বিদুর।
আর আমার কানীন পুত্র? আমি কি কোনদিন পারব পৃথিবীর সামনে তাকে স্বীকার করতে ? আর সে কেমনই বা আছে সূত সারথির ঘরে যেখানে সে পালিত হচ্ছে।
অনেকে বলবেন রাজা তো একজন হতে পারে । তবুও একটা কাহিনী আছে। শান্তনু রাজা হলে বারো বৎসর খরা হয়েছিল । ঋষিরা বলতেন কারণ শান্তনু কনিষ্টপুত্র ছিলেন। তাই পরবর্তীকালে শান্তনু তার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা দেবাপিকে, যিনি সন্ন্যাস ধর্ম নিয়েছিলেন, আমন্ত্রণ করেন । দেবাপি এসে যজ্ঞ করলে বৃষ্টি হয় । আবার যযাতি তার জ্যেষ্ঠ পুত্র যদুকে প্রত্যাখ্যান করে কনিষ্ঠ পুত্র পুরুকে রাজা করেছিলেন। তাই জ্যেষ্ঠ বা কনিষ্ঠের মধ্যে কার বেশি সিংহাসনের অধিকার তখন কোন নির্দিষ্ট আইন ছিল না। রাজা ধৃতরাষ্ট্র অন্ধ ছিলেন বটে তবে পাণ্ডু যুদ্ধ করে যা রাজদত্ত আনতেন সেই সমস্ত ধনরত্ন দিয়ে ধৃতরাষ্ট্র যজ্ঞ করতেন। ভীষ্ম ও বিচিত্রবীর্য এই ভাবে রাজ্য শাসন করেছিলেন। এখানে অনেকটা যৌথ ভ্রাতৃতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা ছিল। এতে সমস্যা এই যে পরবর্তী প্রজন্ম কাকে রাজা বলে মেনে নেবে সেই পথটা সুস্পষ্ট হয়নি । যে জ্যেষ্ঠ তাকে না যে যোগ্য তাকে ? আর কে যোগ্য সেটা বা কি মাপকাঠি দিয়ে ঠিক হবে ?
একদিন আমি গিয়েছিলাম শাশুড়িমা অম্বিকা ও অম্বালিকার কক্ষে। ওখানে সময় এক অন্য তালে চলে। রাজ্যপাটের ব্যস্ততা এদের নেই না আছে দুশ্চিন্তা । তবুও নিজের জীবন নিজের হাতে না থাকলে যে চাপা দুঃখ থাকে সেটা এনাদের ছিল।
‘এস কুন্তী,’ অম্বালিকা আমার শাশুড়ি মা বললেন। ওনারা বয়স হলেও কম বয়সে যে অসামান্যা সুন্দরী ছিলেন তা এখনো বোঝা যায় ।
'তুমি প্রথম যে নিজে স্বয়ংবরে নিজের বর নির্বাচন করেছ। নাহলে এখানে রাণী ও দাসীর মধ্যে বিশেষ পার্থক্য নেই ,’ অম্বিকা বললেন ।
‘থাক সেসব কথা দিদি,’ অম্বালিকা বললেন ।
‘বাহ তোমার পুত্রবধূ কি সুন্দরী ওর চোখ গুলো পদ্ম পাতার মতন যাকে বলে পদ্মলোচনা। আর আমার জন তো চোখ বেঁধেছে । আর স্বামী অন্ধ হলে স্ত্রীকে কে কেন অন্ধ হতে হবে কে জানে ?' বললেন অম্বিকা।
‘আর আমার পুত্র সে তো সবসময় যুদ্ধে যাচ্ছে,’বললেন অম্বালিকা। ভোজ কন্যা তুমি এবার পাণ্ডুকে একটু ঘর মুখী কর।’
আমি মাথা নাড়লাম ।
এতদিন হয়ে গেছে তবুও গান্ধারী সঙ্গে বিশেষ কোন কথাবার্তা হয়নি। একদিন আমি গান্ধারীর কক্ষে নিজে গেলাম ।
‘একি কুন্তী আমাকে আগে বললেই হতে। তুমি তো মহারানী। আমারই তো তোমার কাছে যাওয়া উচিত।’
নিজেকে জেনে শুনে অন্ধ করে এক ঘরে করার কি মানে তা আজও আমি বুঝতে পারিনি। অনেকে বলে এটা গান্ধারী তার পিতার প্রতি অভিমান বা প্রতিবাদ। তবে আমি হলে কোনদিনই এত সহজে হাল ছাড়তাম।
‘নানা দিদি পাণ্ডু আমাকে বলেছে ও প্রথমে কনিষ্ট ভ্রাতা আর রাজা পরে।’
‘আচ্ছা আচ্ছা পান্ডু চিরকালই ঐরকম রাজ্য পাঠের প্রতি কোন লোভ নেই।’ তবে আর্য ধৃতরাষ্ট্রর ও ওর কনিষ্ঠ ভ্রাতার প্রতি ভালবাসা কম নয় ।
‘দিদি আমি যুদ্ধে দুস্থ বিধবা দের জন্য রাণী হিসেবে কিছু কাজ করতে চাই আপনি কি আমার সঙ্গে থাকবেন না?’
‘আচ্ছা আচ্ছা কুন্তী সে হবে খন । যখন আমি গান্ধারে ছিলাম তখন আমার পিতার সঙ্গে রাজসভায় অনেক তর্ক করতাম । তবে এখানে পান্ডু আর ধৃতরাষ্ট্র যেটা পারে আমি আর তুমি পারিনা ।’
‘কেন দিদি?’
‘আমরা তো এসেছি কুরুবংশকে প্রজন্ম দিতে । আর সেই দায়িত্ব এখন তোমার ওপর। তোমাকে নিজের ছোট বোনের মতনই বলছি এখানে শুধু সিংহাসনই আমাদের মধ্যে যা সম্পর্ক তা নির্দিষ্ট করে।’
যদি সিংহাসন আমাদের মধ্যে সম্পর্ক করে তাহলে আমি ভাবলাম যে গান্ধারী আর আমি কি সবসময়ই প্রতিযোগী হয়ে সারা জীবন কাটিয়ে দেব।
তারপরে দেখা করলাম বিদুরের স্ত্রী মালিনীর সঙ্গে । মালিনী বলল, ‘এখানে শান্তনু পত্নী গঙ্গা নিজের সাত সন্তানের বিসর্জন দিয়েছিলেন । যাই হোক বিচিত্রবীর্যের বিবাহের পরও সাত বছর কেটে গিয়েছিল রাণীদের কোন সন্তান হয়নি। তারপর বিচিত্রবীর্য অসুস্থ হয়ে পরলোকগমন করার পর সত্যবতী ভীষ্ম কে বলেছিলেন তার ভ্রাতার স্ত্রীদের বিবাহ করে কুরুবংশকে প্রজন্ম দিতে। তবে ভীষ্ম তার প্রতিজ্ঞা প্রত্যাখ্যান করতে রাজি হননি । তখন একটা উপায়ই ছিল নিয়োগ প্রথা ।’ বাকিটা আমি জানি ।
রাজনৈতিক বিভিন্ন বিষয়ে পান্ডু আমার মতামত নিতেন। অনেক সময় খুব খুশি হয়ে পান্ডু বলতেন, ‘তোমার মতন বুদ্ধিমতি স্ত্রী পেয়ে আমি ধন্য কুন্তী।’
ব্রাহ্মণদের দান বিভিন্ন পূজা বা যজ্ঞে পান্ডুর আমি সহধর্মিনী ও হাস্তিনাপুরের রাণী। ।কিন্তু তবুও বেশ অনেকগুলো মাস কেটে গেছে আমাদের বৈবাহিক জীবন কোনো পরিপূর্ণতা পায় নি। পান্ডুর সবসময়ই নানান রকম ব্যস্ততা। প্রাসাদে নানা রকম গুঞ্জন । যেটা হয় দোষটা আমার আমি মহারাজকে নিজ কক্ষে আনতে পারছি না।
ভীষ্ম গিয়েছিলেন মদ্ররাজ্যে। খবরটা আমার কানে এল যে ভীষ্ম মনস্থির করেছেন পান্ডুর দ্বিতীয় বিবাহ দেবেন। আমার ও হয়ত মনে হতে আরম্ভ করেছিল যে আমার কোনো ত্রুটি আছে। আমার পিতা আমাকে দান করেছিলেন । পালিত পিতা ও তার স্ত্রীরাও আমাকে আপন করেনি। তবে কি এবার স্বামীরও অবহেলা সহ্য করতে হবে। কিন্তু পান্ডুর চোখে তো আমার প্রতি কোনদিনই কোন অবজ্ঞা অবহেলা দেখতে পাইনি। তবে কি এটা আমার নিজের হীনমন্যতা?
একটা কথাই বারবার মনে পড়ছিল মহারাজ পান্ডু কি এই এত শীঘ্র দ্বিতীয় বিবাহের সহমত ছিলেন ? সেটা তো আমার মন কিছুতেই মেনে নিতে পারছিল না । সেই দুশ্চিন্তা থেকে পান্ডু আমাকে মুক্ত করল।
‘এটা পিতামহী সত্যবতী ও জ্যেষ্ঠ তাত ভীষ্মের এক পক্ষের সিদ্ধান্ত এতে আমার কিছু করার নেই।’ এই শুধু পান্ডু বলেছিলেন । তবুও এই সিদ্ধান্ত অন্য ভাবে আমাকে আঘাত করেছিল। আমি পান্ডুকে নিজে স্বয়ংবর মাল্যদান করেছিলাম অন্তত জ্যেষ্ঠ স্ত্রীর সন্মান টুকু কি আমার প্রাপ্য ছিল না। নারী কি শুধু এক প্রজন্ম দেওয়ার জরায়ু ?
তারপরে সত্যবতী দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘আমরা যা চাই তাই যে সবসময় হয় তা নয়। আমার পিতা দাসরাজ ধীবর আমার বিবাহের শর্ত হিসেবে চেয়েছিলেন যে আমার পুত্ররা হস্তিনাপুরের রাজ সিংহাসন অধিকার করবে কিন্তু তাই বা আর হল কোথায় কারণ আমার দুই পুত্রই এখন আর জীবিত নেই।’
‘কুন্তী আমরা চাই পান্ডুর প্রজন্ম এই হস্তিনাপুরের সিংহাসনের অধিকারী হোক,’ সত্যবতী বললেন আমি এটা বলে উঠে পরলাম না এটা আমার অক্ষমতা নয়।
‘রাজারা বহু বিবাহ করে এতে এত মন খারাপের কিছু নেই,' অম্বালিকা আমাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিলেন । ‘তুমি জ্যেষ্ঠা পত্নী এটা কোনদিনই বদলাবে না।’
অভিমানে রাগ দুঃখ মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে গেছিল । তখন আমি বুঝিনি যে ভীষ্মের অধৈর্যতা আমার ভবিষ্যৎ জীবনে এক বড় বিপদ আনবে।
মাদ্রীর সঙ্গে হস্তিনাপুরে পান্ডুর বিবাহ সম্পন্ন হল। মাদ্রী লাস্যময়ী প্রেমময়ী আমি ঈর্ষান্বিত হয়েছিলাম ।তারপর মাদ্রীর সঙ্গে বিবাহের তিরিশ দিন পর পান্ডু দ্বিগবিজয় যাবার ঘোষণা করলেন । পান্ডু দ্বিগবিজয় যাওয়ার পরে একদিন মাদ্রী আমার কক্ষে এসেছিল।
‘দিদি গান্ধারীর সন্তান যদি আমাদের পূর্বে হয় তবে কি হবে কি ভেবেছ?’
‘না সেই দিকটা ভাবিনি।’ আমি স্বীকার করলাম । কিন্তু মহারাজকে আমি সেই ভাবে পাই কোথায়?
‘দিদি মহারাজের শারীরিক কোনো সমস্যা আছে তাই স্ত্রীর পরিপূর্ণতা আমরা পাইনি । আমিও না ।’
‘সে কি মাদ্রী।’ এই কথাটা আমি কোনদিনই স্পষ্ট বুঝে উঠতে পারিনি হয়ত মনে মনে ভেবেছিলাম। মাদ্রী সোজা কথা শুনে সুবিধা হল ।
মহারাজের সঙ্গে আমাকে কথা বলতে হবে এবং যত শীঘ্রই সম্ভব । পান্ডুকে এই সমস্যার থেকে উদ্ধার করতে হবে ।
পান্ডু দ্বিগবিজয় করে ফিরলেন। পান্ডু কাশী পুন্দ্র সুক্ষ্ম বিভিন্ন দেশ পরাজিত করে তাদের থেকে রাজদত্ত মনি মুক্তা অশ্ব হস্তী আদায় করে মহা ধুমধামে ফিরেছেন। । ভীষ্ম আহ্লাদিত হয়ে স্বাগত করতে এগিয়ে গেলেন মহাআনন্দে পান্ডুকে জড়িয়ে ধরলেন। পান্ডু ধনরত্ন রাজ পরিবারের বিশেষ জনের মধ্যে বিলিয়ে দিলেন।
পান্ডুর সঙ্গে কথা বললাম,
‘বিশ্বাস করো কুন্তী যখন স্বয়ংবর গিয়েছিলাম তখন আমি জানতাম না আমার এরকম কোনো সমস্যা হবে।’
‘এ কি বলছেন মহারাজ আপনার যে কোনো সমস্যাই হোক তার থেকে উদ্ধার করাই আমার কর্তব্য।’
‘আমি তোমার মতন স্ত্রী পেয়ে ধন্য কুন্তী। কিন্তু এক ক্ষত্রিয় রাজার শৌর্য বীর্য তার সন্তান জন্ম দেওয়ার ক্ষমতা সবই তো ভগবান প্রদত্ত। যদি তাতে কোন বিচ্যুতি হয় তবে তো আমার রাজ্য ত্যাগ করা উচিত । আমি ক্ষত্রিয় হয়ে কি করে অরণ্যে আশ্রমে লুকিয়ে থাকব বা কোন ব্রাহ্মণের অনুদান গ্রহণ নেব চিকিৎসা নেব নিজের সন্তানাক্ষম হওয়ার জন্য?
‘কিন্তু কোন জ্ঞানী ঋষি তো আমাদের ভবিষ্যৎ বাণীও করতে পারেন, সে ক্ষেত্রে অরণ্যে একটা গোপনীয়তা থাকবে ,’ আমি বললাম।
‘আচ্ছা বেশ আমারও অরণ্যে বিশ্রাম চাই। ’ ঠিক হল পান্ডু আমি ও মাদ্রী বনবিহারে যাব ।আর সত্যবতী ও ভীষ্ম অরাজি হননি কারণ ওরা হয়ত ভেবেছিলেন যে কুরু বংশের উত্তরাধিকারী তো বেশিরভাগ সময় অরণ্যে প্রকৃতির মধ্যে জন্ম হয়েছে।আমি আর মাদ্রী হয়ত এও ভেবেছিলাম যে সন্তান উৎপাদনের ব্যাপারে ভীষ্ম ও সত্যবতীর থেকে মুক্ত হব।
আমরা হাস্তিনাপুর থাকে যাত্রা শুরু করলাম । পূর্বে রাজারা অরণ্যে মৃগয়া করতেন। তাই বনে রাজাদের থাকার সুব্যবস্থা ছিল। দাস দাসী ও বেশ কিছু সৈন্য সামন্ত ছিল। ঋষি ব্যাস পান্ডুকে ঋষি নির্মলের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে বলেছিলেন।
সেই ঋষি জানালেন , ‘মহারাজ আপনি এক যুদ্ধ থেকে এসছেন। নিজেকে স্থির ও সংযত করুন কিছুক্ষণ ধ্যান বা যোগ করুন। মৃগয়া থেকে নিজেকে কিছুদিন বিরত থাকুন । পরবর্তী আপনার মত থাকলে নাহয় আমরা অন্য উপায় ভাবতে পারি। তবে আপনার জ্যেষ্ঠ স্ত্রীর গর্ভে দেবতুল্য সন্তান জন্মাবে। ’
এরপরে পান্ডু কিছুটা নিশ্চিন্ত হয়েছিলেন। কিন্তু এটাই বুঝলাম যে আমার গর্ভে সন্তান হবে এই ভবিষ্যৎ বাণীর পর পান্ডুর কাছে আমি শুধুই জ্যেষ্ঠ স্ত্রী হতে থাকলাম। পান্ডুর সব দুঃখ কষ্ট বোঝা নিয়ে তাকে যে উদ্ধার করবে । আর মাদ্রী রয়ে গেল সেই কাঙ্খিত নারী।
আর তারপর কয়েক মাস কেটে গেল আবার পান্ডু মৃগয়া করতে আরম্ভ করলেন। আর সেই মৃগয়া করতে করতেই একদিন এক ঋষি কিমিন্দম যিনি মৃগরূপে তার স্ত্রীর সঙ্গে মিলনে প্রমত্ত ছিলেন তাকে পাঁচটি বান নিক্ষেপ করে ফেলল।
‘তোমার ব্রাহ্মণ হত্যার দোষ হবে না কারণ তুমি জানতে না যে আমি ব্রাহ্মণ কিন্তু রাজন তুমি এত নিষ্ঠুর কেন?’ সেই মৃগবেশি ঋষি পান্ডুকে জিজ্ঞেস করল। কেউ স্ত্রী সংসর্গ মুহূর্তে কারকে হত্যা করে ?
‘মৃগ পশু হত্যায় ন্যায় অন্যায় কিসের ?’ পান্ডু বলে উঠলেন।
‘আমি পুত্র কামনায় আমার স্ত্রীর সঙ্গে মিলিত হয়েছিলাম। হে কুরু শ্রেষ্ঠ নিজের অন্তরকে জিজ্ঞেস কর কেন তুমি এই হত্যা করেছ।’
মৃত্যুর পূর্বে সেই ঋষি পান্ডুকে অভিশাপ দেন যে স্ত্রী সংসর্গ হলে পান্ডুর মৃত্যু হবে। আর তারপরে আমার ও মাদ্রী দুজনের জীবনে বিপর্যয় নেমে এল।
‘আমার দুই পিতা ছিলেন কুন্তী,’ পান্ডু বললেন ‘ব্যাস ও বিচিত্রবীর্য এক পিতা কামার্ত ছিলেন আর আরেক পিতা ধর্মাত্মা ছিলেন । আমি সেই ধর্মাত্মা পিতার ধর্ম গ্রহণ করব। তোমরা হস্তিনাপুরে ফিরে যাও।’
‘আমার সন্তান যখন হবে না তখন গৃহস্থ ধর্ম করে কি করব?’
পান্ডু ঠিক করলেন তপস্যা করে কৃচ্ছসাধন করবে ভিক্ষুক হিসেবে নিজের জীবন কাটাবে। পান্ডু তখন তার অনুচরদের রাজ মুকুট ও অলংকার রাজবেশ সবই পরিত্যাগ করে ব্রাহ্মণদের দিয়ে জানালেন, ‘তোমারা হস্তিনাপুরে গিয়ে বল আমি প্রব্রজ্যা হয়েছি ।’
পান্ডু আমাকে ও মাদ্রী কেও এরূপ বললেন, ‘তোমরা হস্তিনাপুরে ফিরে যাও ।
‘কিন্তু মহারাজ আমি বা মাদ্রী কেউই হস্তিনাপুরে ফেরত যাব না । আমরাও আপনার সঙ্গে তপস্যা করব এই বলে আমি এবং মাদ্রী আমাদের অলংকার দান করে দিলাম। যদি আপনি আমাদের আপনার সঙ্গে গ্রহণ না করেন তাহলে আমরা এখানে প্রাণ ত্যাগ করব ।’
তখন ঋষি কিমিন্দমকে আমি জানতাম না। আজও বুঝতে পারি না যে কেন সেই ঋষি, সেদিন সেখানে এসেছিলেন । সেদিন বুঝতে পেরেছিলাম যে হস্তিনাপুরে যেখানে আমাদের স্বামী নেই বা পুত্র নেই আমাদের কোন অস্তিত্বই থাকত না। নারী হওয়ার অসহায়তা সেদিন বুঝতে পেরেছিলাম। নারী হিসাবে এরম অসহায় আর কোনদিন হব না হয়ত মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম। আমিও পান্ডু ও মাদ্রীর সঙ্গে অরণ্যের মধ্যে এগিয়ে গেলাম। শুরু হল জীবনের এক নতুন অধ্যায়।
Comments
Post a Comment