জয়া চক্রবর্তী সোমা
মনীষাকে আর কিছুতেই বাঁচতে দেব না আমি।কারণ ওকে আমি অসম্ভব ভালোবাসি।আর তাই এই পৃথিবীতে সব মানতে পারব,কিন্তু ওর বেইমানি নয়।হ্যাঁ ও আমায় ঠকাচ্ছে।দিনের পর দিন রাতের পর রাত।আর আমি স্টুপিড ইডিয়েট, ঠকে যাচ্ছি।ওকে ভালোবেসেছি প্রাণ দিয়ে।ও অনাথ পিতৃপরিচয়হীন বলে বাবা মা মেনে নিল না। শুধু ওকে বিয়ে করব বলে বেরিয়ে এলাম পরিবার ছেড়ে।উদয়াস্ত এই ইলেক্ট্রিক গুডস এন্ড ডিভাইস
রিপেয়ারের কোম্পানীতে চাকরী করে এই ছোট্ট আলাদা সংসারে স্বর্গ গড়ে নিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু মা-ই ঠিক বলেছিল।রক্তের দোষ।তা না হলে, কি দিই নি আমি ওকে? স্ত্রীর মর্যাদা,অফুরান ভালোবাসা, আমার সর্বস্ব।
আর আমি সেদিন হাফ ছুটি করে আমাদের ফার্স্ট এনিভার্সারিতে উপহার দেব বলেই ওর জন্য উপহার কিনতে গিয়েছিলাম।কী বোকা আমি তাই না!একটা আস্ত ইডিয়েট। একটা নাইটি কিনেছিলাম ওর জন্য।আর ও....
মনটা অস্থির হয়ে উঠেছিল।এতটাই অস্থির যে এত দাম দিয়ে কেনা নাইটিটা ট্যাক্সিতে ফেলে চলে এসেছিলাম। বাড়ি ঢুকি নি।লেকের ধারে চুপ করে বসে ছিলাম বিকেল থেকে সন্ধে।কে ওই লোকটা? যার জন্য আমার মনীষা আমায় মিথ্যে বলল?
রাতে বাড়ি ফিরে খুব সাধাসিধা ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করেছিলাম -"আজ বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলে নাকি?" মনীষা যেন কেমন চমকায়।আমি আড়চোখে খেয়াল করি ও আমায় এক দৃষ্টে লক্ষ্য করছে।তারপর বলে-"কই না তো।তোমার মুখ চোখ আজ কেমন কেমন যেন লাগছে।শরীর খারাপ নাকি?" আমি বললাম -"খুব প্রেশার যাচ্ছে অফিসে কাজের।নিশ্বাস ফেলার সময় পাচ্ছি না।" মনীষা একটু চুপ করে থেকে বলল-"কটা দিনের ছুটি নিলে তো পারো।" আমি বললাম-"না ছুটি নিলে হবে না। প্রচুর পেন্ডিং কাজ রয়েছে।" মনীষা দীর্ঘশ্বাস ফেলে।আর কিছু বলে না।ওর ভিতর একটা আড়ষ্টতা অনুভব করছিলাম।অথবা নিজেই হয়ত সহজ হতে পারছিলাম না।ক্রমাগত মনের সাথে যুদ্ধ করে চলেছিলাম।নিজেকে বোঝালাম নিশ্চয় আমি ভুল দেখেছি।যদিও নিজের কথা নিজের কাছেই দুর্বল ঠেকছিল।
এর মধ্যেই এমন একটা ঘটনা ঘটল যে মনীষার স্বপক্ষে সাজানো আমার সব ইতিবাচক যুক্তি ভেঙে পড়ল তাসের ঘরের মত।
সেটা ছিল বুধবার।আমি খুব ক্লান্ত ছিলাম। অফিসের পরে ব্যারাকপুরে এক ছোটবেলার বন্ধুর বাড়ি ওদের প্রথম বছর এনিভার্সারিতে নিমন্ত্রণে যাবার কথা ছিল।মনীষাকে সেই মত বাড়িতে আমার জন্য রান্না করতে বারণ করেই গিয়েছিলাম।কিন্তু বেরোবার মুখে বন্ধুকে ফোন করে শুনলাম ওদের পার্টিতে আমার দাদা আর বৌদিও আসছে।আমার বন্ধুর দাদা আর আমার দাদা বন্ধু ।দাদাই আমার বিয়ের কট্টর বিরোধী ছিল। বলেছিল মনীষার মত মেয়েরা নাকি নোংরা বাপ মায়ের সন্তান হয় বলেই অনাথ আশ্রমে পালিত হয়।এতক্ষণে ক্লিয়ার হল কেন আমার বন্ধু আমাকে একা ইনভাইট করেছে।মনীষাকে নিমন্ত্রণ করে নি।মনীষাকে তবে ওরাও মন থেকে এক্সেপ্ট করেনি।মনটা খারাপ হয়ে গেল।দাদা বৌদির মুখোমুখি হবার কোন ইচ্ছে আর আমার ছিল না।ব্যারাকপুর না গিয়ে কলেজস্ট্রীট গেলাম।উদ্দেশ্যহীনের মত কিছুক্ষণ বইপাড়ায় ঘোরাঘুরি করে বই ঘাঁটাঘাঁটি করে মন খারাপটা কাটল।পুরানো বইএর দোকানে একটা পছন্দের লেখকের বই পেয়ে গেলাম।কিনে বাড়ি ফিরলাম। মনীষা বলল-"এত তাড়াতাড়ি চলে এলে?" আমার ওর মুখের দিকে তাকিয়ে বলতে ইচ্ছে করল না দাদা বৌদির কথা।ওর কাছে ওটা খুব সেন্সিটিভ ইস্যু আমি জানতাম।ছোট্ট করে -"হুঁ" বলে শুয়ে পড়লাম।ও আমার জন্য রান্না করবে না জানাই ছিল তাই আসার সময় এগরোল খেয়ে এসেছিলাম।দাদার কথা উঠতেই ছোটবেলার কথা,মায়ের কথা মনে পড়ছিল।মনীষা কি যেন বলছিল পরের দিনের বাজার নিয়ে,নিমন্ত্রণ বাড়ি নিয়ে।আমার কানের উপর দিয়ে চলে যাচ্ছিল।ভারাক্রান্ত মনে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।ঘড়িতে মিষ্টি সুরে রাত বারোটার ঘন্টা বাজতেই ঘুম ভেঙে গেল।দেখলাম পাশে মনীষা নেই।ভাবলাম হয়ত ওয়াশরুমে আছে।কিন্তু বহুক্ষণ শুয়ে থাকার পরেও মনীষা এল না।আমিও ওয়াশরুমে যাব বলে উঠলাম। ডাইনিং পেরিয়ে ওয়াশরুমের সামনে গিয়ে দেখি মনীষা সেখানে নেই।অবাক হয়ে সবে মনীষা বলে ডাকতে যাব হঠাৎ দেখলাম বারান্দা থেকে ওর মৃদু গলার শব্দ পাচ্ছি।মনীষা খুব আস্তে কাকে যেন ফোন করছে।কাকে?
ওর তো মা বাবা ভাই বোন কেউ নেই।আশ্রমের কয়েকজন বন্ধু আছে।পৌলমী, সুদেষ্ণা বা শ্রীতমা?এরা মনীষার বেশ ক্লোজ জানি।বিশেষত পৌলমী।ছোটছোট চুল, ছেলে ছেলে গড়নের কাঠখোট্টা মেয়েটাকে দেখেওছি বার দুয়েক...বিয়ের আগে এর সাথেই এক নার্সিংহোমে চাকরি করত মনীষা।মাঝে মাঝে ফোন করেও বটে।আমাদের ফ্ল্যাটে এসেওছিল মেয়েটা। কিন্তু তাদের সাথে রাতে চুপিচুপি কথা বলতে যাবে কেন মনীষা? আমি কান খাড়া করে শোনার চেষ্টা করলাম।মৃদু স্বরে একটা দুটো টুকরো কথা কানে এল-"না আমি চাই না সৌমিক এখনই জানুক।...না না তুমিও কাউকে কিচ্ছু বোলো না।...আপাতত গোপন থাক।পরে পরিস্থিতি বুঝে সব সামনে আনব।এখন রাখি।...না: মন খারাপ আর হয় না গো আমার...তুমি তো সব জানো...তুমি ছাড়া এভাবে কার কাছে মন খুলে..." ফোঁপানোর শব্দ পেলাম।বলল-"ভালো থেকো।এখন রাখি।"আমি ভিতরে ভিতরে পাথর হয়ে যাচ্ছিলাম।এত কষ্ট মনীষার!ও সুখে নেই আমার সাথে? অথচ গত এক বছরে কই একবারও তো বিন্দুমাত্র টের পাইনি আমি!কাকে ও এসব বলছে?যার কাছে ও একমাত্র মন খুলে...না আর ভাবতে পারলাম না।
মনীষা বারান্দা থেকে বেরিয়ে এল।আমি দ্রুত অন্ধকারে গা মিশিয়ে বেডরুমে ফিরে এসে বিছানায় শুয়ে ঘুমের ভান করলাম।
পরদিন অফিসে এক মুহূর্ত কাজে মন বসাতে পারলাম না।কী করব বুঝে উঠতে পারছিলাম না।একবার ভাবলাম সরাসরি মনীষাকে প্রশ্ন করব।আজ অফিস ছুটির পর দুজনে কোন একটা রেস্তোরাঁয় খেতে যাব।তারপর ওকে সরাসরি জিজ্ঞেস করব সব।আমি মনীষাকে ফোন করলাম। ফোন আউট ফ রীচ বলছে।আশ্চর্য! মনীষা কি বাড়িতে নেই? পাশের ফ্ল্যাটের আমাদের বাড়িওয়ালি মনি মাসীমাকে ফোন করলাম সঙ্গে সঙ্গে।মনি মাসীমা ফোন ধরতেই বললাম-"মাসীমা মনীষাকে ফোনে পাচ্ছি না।একটু ডেকে দেবেন দয়া করে? একটু দরকার ছিল।" মনি মাসীমা আকাশ থেকে পড়লেন।বললেন-"সে কি বাবা,মনীষা এখনও তোমার অফিসে পৌঁছায় নি? ও তো অনেকক্ষণ বেরিয়েছে।" আমি ফোন রেখে দিলাম।কোথায় গেছে মনীষা আমার অফিস আসার নাম করে?ভাবতে ভাবতেই মনীষার ফোন এল।আমি ধরতেই বলল-"কী গো ফোন করেছিলে? আমি স্নানে ছিলাম। তাই ধরতে পারিনি। বল কেন ফোন করেছিলে।" আমি বললাম-"না এমনি।" মনীষা আরো কিছু কথা বলে ফোন রেখে দিল। আমার সব গুলিয়ে যাচ্ছিল। রাতে থমথমে মুখে বাড়ি ঢুকলাম। মনীষা আমায় দেখে একটু হেসে বলল-"একটা কথা বলব? আমি না তোমায় একটা ছোট্ট মিথ্যে বলেছি আজ।আমি আসলে একটু বেরিয়েছিলাম আজ।তোমার জন্য এই বডিস্প্রেটা কিনতে।তুমি পাছে রাগ করো তাই তখন বললাম যে স্নানে ছিলাম বলে ফোন ধরতে পারিনি।" আমি কিছু বললাম না।মুখে হাসি এনে বললাম "থ্যাংক ইউ।" মনে মনে বললাম -"মনীষা তুমি বডি স্প্রে কিনতে যাও নি।বডি স্প্রে পাড়ার দোকানেও পাওয়া যায়।তার জন্যে অনেকক্ষণ সময় বা আমার অফিস যাবার মত বাহানা দেবার প্রয়োজন হয় না।তুমি অন্য কোথাও গিয়েছিলে আর পরে ফিরে নিশ্চয় মাসীমার কাছে শুনেছ যে আমি ফোন করেছিলাম।তাই এখন আগে ভাগে যুক্তি দিচ্ছ।" মনটা বিষাক্ত হয়ে উঠল।মনীষা আমার জন্য চা আর টিফিন করতে রান্নাঘরে যেতেই ভাবলাম ওর মোবাইলটা একবার চেক করি।কিন্তু খুলতে পারলাম না।মনীষা পাসোয়ার্ড দিয়ে রেখেছে।বিক্ষিপ্ত হয়ে ছুঁড়ে ফেললাম ফোনটা খাটে।
রাতে কিছুতেই ঘুম এল না।ভোর রাতে চোখ লেগে গেল।স্বপ্ন দেখলাম মনীষা ওই গাড়ির লোকটার খোলা বুকে মুখ ঘষছে।লোকটা মনীষাকে জড়িয়ে ধরছে।ঘুম ভেঙে গেল।ঘেমে স্নান করে গেছি।বুকের ভিতর নিজের হৃদপিন্ডের শব্দ নিজে শুনতে পাচ্ছি।মাথা চেপে বসে রইলাম। আর ঠিক সেই সময় গতকালের সকালের খবরের কাগজের উপরের কোণের দিকের একটা পাতায় চোখে পড়ল ছোট্ট বিজ্ঞাপন।ডিটেক্টিভ এজেন্সির বিজ্ঞাপন।পাতাটায় সারিবদ্ধ অনেকগুলোই ডিটেক্টিভ এজেন্সির নাম রয়েছে।
আমি উপরের কোণের দিকে বোল্ডে লেখা ওই বিজ্ঞাপনের ফোন নম্বরটা মোবাইলে সেভ করে নিলাম।ভগবানই হয়ত আমায় এই রাস্তা দেখালেন। না হলে কাগজটার এভাবে এই পাতাটাই বা খোলা থাকবে কেন?আর ভিতরের পাতার এই ছোট ছোট বিজ্ঞাপন আমার চোখে পড়বেই বা কেন?
অফিসের লাঞ্চ আওয়ারে ফোন করলাম। এক ভদ্রমহিলা ফোন ধরলেন।এপয়েন্টমেন্ট করলাম।উনি বললেন ঠিক বিকেল পাঁচটায় দক্ষিণ কলকাতার এক নামী কফিশপে চলে আসতে।আমি অফিসে বলে একটু আগে বেরিয়ে গেলাম।ভদ্রমহিলা আগেই পৌঁছেছিলেন কফিশপে।দেখে বেশ করিৎকর্মা চটপটেই মনে হল।রোগা লম্বা ছিপছিপে চেহারা।চোখে মুখে বুদ্ধির তীক্ষ্ণতা আছে।আমরা মুখোমুখি বসলাম।কফি অর্ডার করার পর ভদ্রমহিলা সরাসরি কাজের কথায় এলেন।ওনার নাম কুহেলি সেন।বললেন-"ওয়েল মিস্টার সৌমিক ব্যানার্জী, আপনি মনে করছেন যে আপনার স্ত্রীর কারোর সাথে এক্সট্রা ম্যারিটাল এফেয়ার চলছে।আপনি সেটাই কনফার্ম করতে চাইছেন তো?" আমার নিজের কানেই একস্ট্রা ম্যারিটাল শব্দটা কেমন বিচ্ছিরি শোনাল।মাথা নিচু করে বললাম, হ্যাঁ।ভদ্রমহিলা বোধহয় আমার অবস্থা বুঝলেন।আমার হাতে চাপ দিয়ে বললেন-"ডোন্ট বি আপসেট মি: ব্যানার্জী।আমরা চাইব আপনার সন্দেহ মিথ্যে প্রমাণ হোক।তবে সত্যিটা আপনার সামনে তুলে ধরাই আমাদের কর্তব্য।আমরা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সেটাই করব।"
মনীষার ছবি হোয়াটসঅ্যাপে কুহেলীকে ট্রান্সফার করে এডভান্স পেমেন্টের গোলাপী খামটা ওর হাতে দিয়ে কফিশপ থেকে বেরিয়ে এলাম দুজনে।মনে পড়ল পরশু আমাদের এনিভার্সারি।প্রথম এনিভার্সারি।কত স্বপ্ন ছিল দিনটা নিয়ে।আর আজ...
রাতে ডিনার টেবিলে আজ দুজনই আমরা দুজনের সাথে ঠিক ভাবে কথা বলতে পারলাম না।ছাড়া ছাড়া কিছু কথা।যেন সুর কেটে গেছে।একটা অসহিষ্ণুতা আমায় পেয়ে বসেছে।মনে মনে একটাই কথা ভেবে চলেছিলাম।
হে ঈশ্বর যেন কুহেলি জানায় যে 'মি: ব্যানার্জী আপনার ধারণা সঠিক নয়, আপনার স্ত্রী সম্পূর্ণ নির্দোষ'।
কিন্তু ঈশ্বর আমার কথা শোনেননি।
পরেরদিন সন্ধ্যায় কুহেলি আমার মোবাইলে কিছু ছবি পাঠিয়েছিল।আমার স্ত্রী আর একজন অন্য পুরুষের বিভিন্ন মুহূর্তের ছবি।কফি শপে মুখোমুখি বসে, গঙ্গার ঘাটে পাশাপাশি আর মেট্রো স্টেশানে লোকটা মনীষার কাঁধে হাত দিয়ে তাকে জড়িয়ে রেখেছে।এতই মগ্ন ওরা মনীষার শাড়ী এলোমেলো। ছবিটা দেখে আমার মাথায় আগুন জ্বলে গেল।আমি আর সহ্য করতে পারিনি।সেই মুহূর্তে স্থির করেছিলাম মনীষাকে মেরে ফেলব।কুহেলি আমায় ফোন করে বলেছিল এগুলো প্রাথমিক ভাবে পাঠিয়েছে।শিওর ইনভেস্টিগেশন করে দু একদিনের মধ্যে পুরো নাম পরিচয়, মনীষার সাথে তার প্রকৃত সম্পর্ক সব জানাবে ও।কিন্তু আমার আর কিছু... কিচ্ছু জানার দরকার ছিল না।কিন্তু কুহেলিকে অন্য কথা বললাম।বললাম-"দরকার নেই।আমার কাছে সব জলের মত পরিষ্কার।আসলে ওকে বড্ড ভালোবাসি তো তাই অকারণেই পজেসিভ হয়ে পরেছিলাম।ওকে ছেড়ে এক মুহূর্ত থাকার কথা ভাবতেও পারি না।সেই ইন্সিকিউরিটি থেকেই সন্দেহ এসেছিল।কিন্তু এখন আমার মনের সব মেঘ কেটে গেছে।আমার স্ত্রীর পাশের ভদ্রলোক ওরই বন্ধু।আমি শিওর ওর কোনো বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক নেই...তাই আর অনুসন্ধানের দরকার নেই।কাল কাইন্ডলি একবার ফার্স্ট আওয়ারে আমার অফিস থেকে আপনার বাকি পেমেন্টটা যদি কালেক্ট করে নেন ভালো হয়।আর হ্যাঁ আগামীকাল আমাদের এনিভার্সারি।আপনার নিমন্ত্রণ রইল।অবশ্যই আমার স্ত্রীর সামনে আপনাকে আমার বান্ধবী হিসাবেই পরিচয় করাবো।প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটর হিসেবে নয়।" এক টানা কথাগুলো বলে নিজের রসিকতায় নিজেই হাসলাম।
কুহেলি বলল-"কংগ্রাচুলেশনস। আপনাদের দাম্পত্য জীবন সুখময় হোক এই কামনা করি।"
স্ত্রীর প্রতি আমার সন্দেহ ছিল একথা প্রকাশ পেলে মনীষাকে খুন করার জন্য আমার প্রতি সন্দেহ আসতে পারে।তাই কুহেলিকে আগে থেকে এসব বলে রাস্তা পরিষ্কার করলাম।মনীষাকে ডিভোর্স দিতেই পারতাম। কিন্তু তাতে তো দাদা বাবা মা বৌদি সবাই হাসবে আমার বোকামি দেখে।না সে সু্যোগ আমি দেব না।মনীষার মৃত্যুটা হবে একটা এক্সিডেন্ট। আমার অনুপস্থিতিতে।আমি যখন অফিসে একশোটা লোকের সামনে বসে কুহেলি সেনকে পেমেন্ট করব তখনই আমার বাড়িতে হবে ভয়ানক এক্সিডেন্ট...বেইমানির যথাযোগ্য শাস্তি পাবে মনীষা।আমাদের ফ্ল্যাটের ওয়াশরুমের সুইচটা অনেকদিন ধরেই ওটা ডিস্টার্ব করছে। ওটাকেই বেছে নিলাম হাতিয়ার করে।রাতে বাড়ি ফেরার পথে কিছু টুকিটাকি জিনিষ কিনে নিলাম।বাথরুমে হাতমুখ ধোওয়ার সময় বাথরুমের উপরের বাঙ্কে প্যাকেটটা রেখে দিলাম।
গত রাতে সারারাত আমি মনীষার ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে থেকেছি।কী মায়াময়,কি নিষ্পাপ একটা মুখ! একবার ভাবলাম ওকে ছেড়ে চলে যাই।কিন্তু পরমুহূর্তে ওর প্রেমিকের সাথে ওর কন্ঠলগ্ন ছবিটা ভেসে উঠল চোখের সামনে।না, মনীষা আমার ভালোবাসা নিয়ে খেলা করেছে,আমার আবেগ আমার বিশ্বাস সব কিছু নিয়ে খেলা করেছে।আমার মনটাকে মেরে ফেলেছে ও।মানুষের চেয়েও মানুষের বিশ্বাসকে খুন করা ঢের বেশী অপরাধ।ওর মত বিষাক্ত সাপের বাঁচার কোন অধিকার নেই।
মনীষার কপালে চুমু খেয়ে ঘুম ভাঙালাম।বললাম-"হ্যাপি এনিভার্সারি।" ও অদ্ভুত হাসল।মনীষা কি চিরকালই এরকম করেই হাসে? কই কখনও তো মনে হয় নি যে ওর হাসির পিছনে এমন তীক্ষ্ণতা আছে!যেন ব্যঙ্গের হাসি।আমি তাড়াতাড়ি বাথরুমে চলে যাই। বাথরুমে স্নানের সময় বাঙ্কের উপর থেকে কালকের কেনা জিনিষগুলো নামিয়ে বাথরুমের ভিতর সন্তর্পণে খুলে নিই সুইচ। তারপর আমার প্রফেশনাল দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে এমন ভাবে বসিয়ে দিই সুইচটা যাতে মনীষা হাত ছোঁয়ানো মাত্র সুইচ ওকে আঁকড়ে ধরে বৈদ্যুতিক আকর্ষণে।ততক্ষণ অবধি না ছাড়ে যতক্ষণ না মনীষার দেহ নিথর হয়ে যায়।
জিনিষগুলো দ্রুত তৎপরতায় গুটিয়ে তোয়ালে দিয়ে কায়দা করে মুড়ে ঘরে নিয়ে এলাম।অফিসের ব্যাগে তা ঢুকিয়ে নিলাম।অফিস যাবার পথে একটা আবর্জনা ফেলার জায়গা পড়ে।ওইখানে ফেলে দেব।চটপট রেডি হয়ে নিলাম।পিছন ঘুরতেই দেখি মনীষা দরজার কাছে এসে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।আমাকেই দেখছে নির্নিমেষ। আমি ভ্রু নাচিয়ে বললাম -"কী দেখছ?" ও কেমন অদ্ভুত হেসে বলল-"তোমাকে।" তারপর বলল-"হ্যাপি এনিভার্সারি বাবু।" আমি ওর কপালে চুমু খেলাম।কিন্তু আজ আর বললাম না রাতে তাড়াতাড়ি ফিরব।ও-ও বলল না তাড়াতাড়ি এস।আমি বেরিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে ওকে দেখলাম বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে।অবাক লাগল।মনে হল ওর চোখে জল দেখলাম।
রাস্তায় একটা আবর্জনা ফেলার জায়গায় জিনিষগুলো ফেলে দিলাম।ভিতরে ভিতরে ভীষণ অস্থির হয়ে আছি।মনীষার মুখটা বার বার মনে পড়ছে।মনে হচ্ছে ঠিক করিনি।ইচ্ছে করছে ছুটে চলে যাই ওর কাছে।গিয়ে সরাসরি সব কিছু বলি।কিন্তু পরমুহূর্তেই একটা আড়ষ্টতা এসে আমার হাত পা জড়িয়ে ধরছে।
মোবাইল বেজে উঠল।কুহেলি নিচে এসেছে।আমি রিসেপশানে ফোন করে বললাম ওকে উপরে পাঠিয়ে দিতে।চটপট চেকটা রেডি করে খামে ভরে মুখ বন্ধ করলাম।কুহেলি ঢুকতেই এক গাল হেসে ওকে বললাম-"ওয়েলকাম ম্যম।অনেক বিরক্ত করেছি আপনাকে।তার জন্য সত্যিই ক্ষমাপ্রার্থী।" কুহেলি হেসে বলল-"আরে না না।বিরক্ত কেন?এটাই তো আমার কাজ।" টুকটাক আরো কিছু কথার পর চেক এর খামটা ওঁর দিকে এগিয়ে দিলাম।বললাম-"দেখে নিন।" কুহেলি ভদ্র হেসে বলল-"ইটস ওকে।" কুহেলি চলে গেল।আমি গলার টাইটা আলগা করলাম।জানলা দিয়ে দেখলাম কুহেলী মেন গেট দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে।যেতে যেতে খামটা ছিঁড়ে চেকটা বার করে দেখে নিল একবার।তারপর খামটা ফেলে চেকটা ব্যাগে ভরে একটা চলতি ট্যাক্সি ধরে নিল।কিছুটা নিশ্চিন্ত হলাম। কিন্তু পাশাপাশি বেশ উৎকন্ঠা বোধ করছি।আচ্ছা মনীষা এখন কি করছে?একবারও কি ওয়াশরুম যায়নি এর মধ্যে?ভাবতে ভাবতে উত্তেজিত হয়ে উঠলাম।একবার ফোন করে দেখলাম।ওদিকে বেজে বেজে কেটে গেল।তার মানে কি সব শেষ? নাকি রান্নাঘর থেকে শুনতে পায়নি ফোনের আওয়াজ।উফ...এভাবে অপেক্ষা করা যায়।আমার মনে হয় প্রেসার বেড়েছে।গরম লাগছে। এ.সি স্পীড বাড়িয়ে দিলাম...
মনীষা বারন্দায় দাঁড়িয়ে থাকে যতক্ষণ পর্যন্ত সৌমিক গলির মুখে অদৃশ্য হয়।চোখটা ঝাপসা হয়ে আসে।মনে মনে বলে-"কেন সৌমিক কেন? কেন করলে আমার সাথে এরকম? আমি তো তোমায় সত্যিকারের ভালোবেসেছিলাম।"মনীষা ঘরে আসে।ফোনটা তুলে নিয়ে পৌলমীকে কল করে-"আমি আর আধঘন্টার মধ্যেই বেরোচ্ছি রে...হ্যাঁ সীমটা খুলে ফেলছি...না না কোন কিছুই নিয়ে যাচ্ছি না...নতুন পরিচয়েই জীবনটা শুরু করব..মনীষা মরে যাবে।বেঁচে উঠবে মানসী।" ফোনটা কেটে দেয় মনীষা।হ্যাঁ আজ সে চিরতরে সব কিছু ছেড়ে চলে যাচ্ছে।সৌমিককে তো সে সত্যিকারের ভালোবেসেছিল।কিন্তু সৌমিক তো শুধু ব্যবহার করে গেছে ওকে।ঠকিয়েছে।সেদিন পৌলমীর সাথে সাউথ সিটি মলে সৌমিকের জন্যই এনিভার্সারি গিফট কিনতে গিয়েছিল।পাঁচ মিনিট আগে যে মানুষটা বলেছে সে অফিসে কাজে ব্যস্ত সে সাউথ সিটি মলে কী করছে! সৌমিক মনীষাকে দেখতে পায় নি।কৌতুহল বশেই মনীষা ফলো করেছিল সৌমিককে।সৌমিক একটা লাল নেটের নাইটি কিনল।মনীষা ভেবেছিল নিশ্চয় এটা তাকে এনিভার্সারিতে সারপ্রাইজ গিফট করবে বলেই কিনেছে সৌমিক।সে অবশ্য কিছু কিনে উঠতে পারে না।সবকিছুই বেশ দামী এখানে।সৌমিক যাতে দেখে না ফেলে তাই দ্রুত পৌলমীর সাথে উবেরে উঠে বাড়ি ফিরে আসে।কিন্তু রাতে সৌমিক খালি হাতে ফেরে।আশ্চর্য হয় মনীষা।অফিস থেকে দুপুরে বেরিয়েছে যে লোকটা সে এতক্ষণ কোথায় ছিল। কার জন্য ওরকম একটা উপহার কিনতে পারে সৌমিক?এই সব চিন্তা মনকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছিল।সবচেয়ে বড় কথা সৌমিক মিথ্যে বলছিল।অস্বীকার করছিল যে সে দুপুরে অফিস ছেড়ে বেরিয়েছে।বলছিল তার অফিসে নাকি ভীষণ চাপ।মনীষা হয়ত তবু নিজের মনকে বুঝিয়ে নিত।কিন্তু সৌমিকের বন্ধুর এনিভার্সারির দিন যেটা ঘটল সেটাতে কোনোমতেই আর নিজেকে বোঝাতে পারছিল না মনীষা।সৌমিক জানত না বিদীপ্তা মানে সৌমিকের বন্ধুর স্ত্রীকে মনীষা আগে থেকে চিনত।একই কলেজে পড়েছে দুজনে।ওদের এনিভার্সারির দিন সকালে ফেসবুক ঘাঁটতে গিয়ে ছবি দেখে চিনতে পারে মনীষা।মনীষার আগাগোড়াই খুব অবাক লেগেছিল যে এনিভার্সারির নিমন্ত্রণে সৌমিকের বন্ধু একা সৌমিককে কেন নিমন্ত্রণ করেছে।প্রায় কাছাকাছি সময়ে বিয়ে হওয়া দুই বন্ধু ওরা।তাই মনীষাকে নিমন্ত্রণ করাই তো ছিল স্বাভাবিক।কারণটা বুঝতে পারে সৌমিক সাড়ে দশটার মধ্যে বাড়ি ফিরে আসায়।ব্যারাকপুর থেকে নিমন্ত্রণ খেয়ে এত তাড়াতাড়ি কী করে ফিরল সৌমিক? সৌমিক অন্য কোথাও গিয়েছিল? কিন্তু সৌমিক সে কথা স্বীকার করে না।মনীষা খেয়াল করে বিদীপ্তা আর তার বন্ধুত্বের কথা সে যখন বলে চলেছে সৌমিকের মন সেদিকে নেই।সে মনীষার কথা শুনছে না।অন্য কিছু ভাবছে।কার কথা ভাবছে সৌমিক? আরো চমকায় যখন সৌমিকের অফিসের ব্যাগে একটা বই পায়।কোন এক সুমিতা'র বই।ভিতরের পাতায় নীল কালিতে লেখা।কে এই সুমিতা যে নিজের প্রেমের কবিতার বই উপহার দিয়েছে সৌমিককে?সৌমিকের অফিস তো সাতটায় বন্ধ হয়।তবে কি তার পরের সময়টা বন্ধুর এনিভার্সারিতে না গিয়ে সৌমিক এই মেয়েটার সাথে ছিল?মনীষা সৌমিকের শার্টের কলারে লাল টম্যাটো সসের দাগ দেখেছে।তবে কি এই মেয়েটাকে নিয়ে রেস্টুরেন্টে খেতে গিয়েছিল সৌমিক? সে বাড়ি ফিরে না খেয়েই শুয়ে পড়ল কি সেই জন্যই?তবু শেষ সন্দেহটুকু দূর করতে মরীয়া মনীষা সৌমিক ঘুমিয়ে পড়ার পর বিদীপ্তাকে ফোন করে।জানতে পারে যে সৌমিক ব্যারাকপুর যায়নি।মনীষার পৃথিবীটা দুলে ওঠে।মনে পড়ে বিয়ের সময় অনেকেই বলেছিল -"মনীষা সাবধান।পিতৃপরিচয়হীন মেয়েকে নিয়ে বিয়ে বিয়ে এই খেলাটা সৌমিক শুধু তোকে কাছে পাওয়ার জন্য খেলছে না তো? পাওয়া হয়ে গেলেই খালি চায়ের ভাঁড়ের মত হয়তো ছুঁড়ে ফেলে দেবে।" মনীষা যেন বিশ্বাস করতে পারে না যে সৌমিক এমন করতে পারে।আবার চোখ বুজে এটাও বিশ্বাস করতে পারে না যে যা সে দেখছে বুঝছে সব ভুল।সেই রাতেই প্রায় রাত বারোটায় একমাত্র প্রাণের বান্ধবী পৌলমীকে ফোন করে সে। সব বলে।
পৌলমী ওর কাঠখোট্টা ছেলে ছেলে স্বভাবে স্বাভাবিকভাবেই এই প্রতারণার কথা শুনে মারাত্মক রেগে ওঠে।মনীষাই ওকে শান্ত থাকতে বলে।পৌলমী বলে -"তুই একটা ইডিয়ট। তাই এখনও বিশ্বাস করছিস।এসব ছেলেরা শুধু মেয়েদের কমোডিটির মত ব্যবহার করে।তোকে আগেই সাবধান করেছিলাম।" পৌলমীই ডিটেক্টিভ এজেন্সির হেল্প নেওয়ার আইডিয়াটা দেয়।পরের দিনই খবরের কাগজের ভিতরের পাতায় সারিবদ্ধ বিজ্ঞাপনগুলো থেকে নিচের কোণের দিকের একটা বিজ্ঞাপন দেখে একটা ফোন নম্বর টুকে নিয়ে ফোন করে।এই সূত্রেই আশীষ সরখেলের সাথে আলাপ হয়।প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটর আশীষ সরখেলের সাথেই দেখা করতে গিয়েছিল।বেরোনোর সময় দেখা হয়ে গেল বাড়িওয়ালা পাশের ফ্ল্যাটের মণি মাসীমার সাথে।ভদ্রমহিলার সবেতেই অনাবশ্যক কৌতুহল।জিজ্ঞেস করলেন -"কোথায় যাচ্ছ বৌমা?" মনের মত উত্তর না পেলে সন্দেহ করতে পারে ভেবে মনীষা বলে যে সে সৌমিকের অফিসেই একটা দরকারে যাচ্ছে।কিন্তু কপাল খারাপ। কফিশপে থাকায় ফোনে পায়নি ওকে সৌমিক।ফোনে না পেয়ে ফোন করে বসে মনি মাসীমাকেই।ভাগ্যিস সে বাড়ি ফেরার সঙ্গে সঙ্গে মনি মাসীমা বলেছিল সৌমিকের ফোনের কথা।পরিস্থিতি সামাল দিতে মনি মাসীমা আর সৌমিক দুজনকেই গাদা গাদা মিথ্যে বলতে হয়েছিল মনীষাকে।বডিস্প্রের গল্পটা বলেছিল কারণ মনীষা চায় নি সৌমিক এটা বুঝুক যে সে সন্দেহ করছে।কোনো সাবধান হবার সু্যোগ সে দিতে চায় নি সৌমিককে।
পরের দিন অশীষ যখন ফোন করে কফিশপে দেখা করতে বলে মনে প্রাণে ঈশ্বরকে ডেকেছিল মনীষা যেন আশীষ বলে যে তার সন্দেহ সম্পূর্ণ অমূলক।কিন্তু মনীষার কপাল যদি এত ভালোই হত তবে শৈশব থেকে এভাবে মানুষ হবে কেন সে?আশীষ দেয় সৌমিক আর ওর গোপন প্রেমিকার হাত জড়িয়ে বসে থাকা ছবি, ওর হাতে গোলাপী খামে কিছু উপহার দিচ্ছে তার ছবি।আশীষ অবশ্য বলে আরো ডিটেলে সে এর পর জানাবে।কিন্তু মনীষার পৃথিবী দুলছিল।সৌমিক তবে সত্যি ঠকাচ্ছে তাকে।এই মেয়েটার জন্যই উপহার কিনেছিল,এই মেয়েটার বইই এনেছিল।এর সাথেই খেতে গিয়েছিল মিথ্যে বলে রেস্তোরাঁয়!মনীষার এক মুহূর্তে মনে হয় বেঁচে থাকা অর্থহীন।কফিশপ থেকে আশীষকে বিদায় জানিয়ে স্খলিত পায়ে মেট্রো স্টেশানে এসে দাঁড়ায়।একটা ট্রেন আসছে শুনে এগিয়ে যায় লাইনের দিকে।অতলান্ত অন্ধকার মনে হয় সুড়ঙ্গটাকে।ধীরে ধীরে প্লাটফর্মের কোণায় চলে আসে।এই প্রতারিত জীবন আর রাখতে চায় না সে।কিন্তু শেষ মুহূর্তে আশীষ সরখেল হ্যাঁচকা টানে সরিয়ে আনে।হু হু করে ট্রেন চলে যায়।নিজেকে সামলাতে অনেকটা সময় চলে যায় মনীষার।আশীষ ওকে জোর করে নিয়ে যায় গঙ্গার ঘাটে।কান্নায় ভেঙে পড়ে মনীষা।আশীষ অনেক বোঝায় যে এত ভেঙে পড়ার কিছু নেই।আপাত ভাবে একটা ছবি দিয়ে কিছুই সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব নয়।কিন্তু মনীষার আর বোঝার কিছু বাকি ছিল না।শুধু তো একটা ছবি নয়।মিথ্যের পর মিথ্যের জাল বুনে গেছে লোকটা।এমন বেইমানের বেঁচে থাকার অধিকার নেই।বাড়ি এসেও এক মুহূর্ত স্বস্তি পায়নি।ডিনার টেবিলে নিজেকে শান্ত রাখতে চেষ্টা করেছে।কিন্তু কিছুতেই স্বাভাবিক হতে পারে নি।লোকটাকে যেন কিছুতেই সহ্য করতে পারছে না সে।অথচ কী করবে তাও ভেবে পাচ্ছে না।পরের দিনটা সারাক্ষণ ভেবে গেছে।পৌলমীকে সব বলেছে।পৌলমীরও চোয়াল শক্ত হয়েছে।বলতে বলতে কেঁদে ফেলেছে মনীষা।তারপর একসময় চোখ মুছে উঠে বসেছে।না এই প্রতারণার একটাই শাস্তি মৃত্যু।পৌলমীকে বলেছে সে বিষ চায়।বলেছে -"আমাকে হসপিটালের ল্যাব বা ওষুধের স্টক থেকে এনে দিতে পারবি? খুব আর্জেন্ট।" প্রথমে পৌলমী আঁতকে উঠেছে।ভেবেছে মনীষা হয়ত নিজের জন্যই চাইছে।কিন্তু জ্বলন্ত চোখে মনীষা বলেছে -"ওই বেইমানটার জন্য মরা মানে নিজেকে অসম্মান করা।আমি মরব না।মারব।যাতে আর কোন মেয়ের জীবন ও নষ্ট করতে না পারে।"সেদিন বিকেলেই পৌলমী গোপনে দিয়ে গিয়েছিল শিশিটা।রাতে সৌমিক ফিরে ওয়াশরুম গেলে মনীষা তৎপর ভাবে অফিসের ব্যাগে ওর জিনিষপত্র হাতড়ায়।হাতে পড়ে সেই একরকম গোলাপি খাম।মনীষার মনটা বিষাক্ত হয়ে যায়।ঠিক এরকম খামটাই সে দেখেছিল ছবিতে।ওয়াশরুম থেকে ফিরে আসে সৌমিক তাই তখনকার মত সরে যায় মনীষা।কিন্তু আজ সকালে ওয়াশরুমে অন্য অন্য দিনের থেকে অনেকটা বেশী সময় নিচ্ছিল সৌমিক।আর ঠিক সেই সময় মনীষা খামটা বের করে তার মুখের কাছে মাখিয়ে দেয় অব্যর্থ মৃত্যু গরল।সে জানে সৌমিক সবসময় জিভে আঙুল ভিজিয়ে খাম খোলে ও আটকায়।সে তার প্রেয়সীকে উপহার দেওয়ার সময়ও নিশ্চয় ব্যতিক্রম হবে না।আর উপহার গ্রহণ করে যদি এই বিষে সেই কালনাগিনীও কোন ভাবে মরে,তবে তো সোনায় সোহাগা।নিজের কিডসব্যাগটায় অতি প্রয়োজনের জিনিষগুলো ঢোকাতে ঢোকাতে এসবই ভাবছিল মনীষা।সে চলে যাবে বিহারের প্রত্যন্ত এক গ্রামে এক জমিদার গোছের বাড়িতে আয়ার কাজ নিয়ে।বিয়ের আগেও করতো। বিহারী পরিবারটায় সে বাচ্চা সামলাবার কাজ পেয়েছে পৌলমীর কথায়।কেউ আর কোনোদিন তাকে খুঁজে পাবে না।কিডস ব্যগের চেন আটকে দেয় মনীষা। এবার এ বাড়ি ছেড়ে চিরতরে মনীষার বিদায়ের পালা।যাবার আগে কিডসব্যাগটা ডাইনিং রুমে রেখে একবার ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়ায় মনীষা।ওয়াশরুমের সামনে একটা স্ক্রু পায়ে ফোটে।অবাক হয় মনীষা এটা কোথা থেকে এল।ভাগ্যিস বেশী জোরে লাগে নি।ওয়াশরুমের ভিতরে আলোর সুইচে হাত ছোঁয়ায় মনীষা...
সৌমিককে হাসপাতালে দেবার পর অফিস থেকে প্রচুর ফোন করেছিল। কিন্তু ধরার জন্য মনীষা তখন ছিল না।সৌমিককেও বাঁচানো যায় নি।হাহাকার করে কাঁদছিলেন সৌমিকের মা।পুলিশ বুঝতে পারছিল না কী করে মারা গেল সৌমিক আর মনীষা।বাথরুমের সুইচটা নড়বড়ে ছিল তা বাড়িওয়ালা ভদ্রমহিলাই জানিয়েছেন।কিন্তু সৌমিকের ক্ষেত্রে যে বিষ পেটে পাওয়া গেছে তা ক্রিয়া করতে আধঘণ্টা সময় লাগে।সুতরাং অফিসের লোক, অথবা যে রহস্যময়ী ভদ্রমহিলা দেখা করতে এসেছিলেন এ কাজ তাদেরই কেউ করেছে।মহিলার খোঁজ মেলে নি।পুলিশ চেষ্টা চালাচ্ছে।কুহেলি আশীষ আর পৌলমী তিনজনেই খবরের কাগজের ভিতরের পাতায় খবরটা পড়েছিল।কিন্তু কুহেলি ঝঞ্ঝাটে জড়াতে চায় নি আর।আশীষের একটা হালকা সন্দেহে ভ্রু কুঁচকে ছিল।কিন্তু যে কেসে সে পারিশ্রমিক পায় না তার জন্য বেকার মাথা সে ঘামায় না।আর পৌলমী সামনে আসতেই চায় নি।কারণ বিষটা সেই জোগাড় করে দিয়েছিল...
Comments
Post a Comment