পত্রিকার কথা
.jpg)
বহু বছর ধরে একটা বাংলা পত্রিকা প্রকাশ করার কথা ভাবছি ও চেষ্টা করে চলেছি। নানা সংসার ও কর্মজীবনের ঝামেলার ফলে আমার জীবনের সাহিত্যচর্চার ছেদ বারবার পরতে থাকে। নতুন করে উদ্দীপনা উৎসাহ এলো জীবনের অনেকটা পথ পার হয়ে। তাই আজ নতুন করে সাহিত্যচর্চা করব বলে মনস্থির করেছি। আমি কবি বা লেখিকা নই। কিছু লিখতে চাইছি।
জীবনের শেষ বেলায় সাহিত্যচর্চা শুরু করেছি দেখে পরিচিত লোকেরা বলছে যে এতো জীবনের শেষ বেলায় কিশোরীর খেলা শুরু হয়েছে। কৈশোরে সব মানুষই কবিতা, গল্প, ডায়েরী কত লোককে কত চিঠি লেখে।কত কল্পনা করে, কত কথা ভাবে আর নিজের মনে লিখে যায়। কল্পনা বেশি থাকে বলে প্রকৃতির সাথে মনের যোগাযোগ থাকে বেশি। আজ আমার কিশোরী বেলার মন হারিয়ে গেছে।
আজ মনে কল্পনা নেই আছে আমার চারপাশে বাস্তব জগতের বিভিন্ন ঘটনা দেখা বা শোনার অভিজ্ঞতা। জীবনধারণের জন্য সাংসারিক কর্ম ও অর্থনৈতিক কর্ম আমাকে ব্যস্ত রাখে কিন্তু তা সত্বেও আমার চারপাশে প্রতিদিন যা যা ঘটনার কথা শুনেছি বা দেখেছি তা আমার মনে আলোড়ন সৃষ্টি করে। আমার বাড়ির সামনে রাস্তার দুধারে ফুটপাতে বাজার বসে। এত মানুষের আনাগোনার মধ্যে কত ঘটনা ঘটে যায়। কত মানুষের জীবন সংগ্রামের আশা ভঙ্গের কাহিনী, কত দুঃখ শোকের ঘটনা আমি জানতে পারি। মনের খাতায় কত কথা লিখি। কিন্তু কাগজের খাতায় সাহিত্যের ভাষায় লিখতে পারি না। নিজের সাদামাটা ভাষায় যা লিখি বা নিজের চিন্তা প্রকাশ করি তা সাহিত্যের ভাষা নয়। এটাই আমার অক্ষমতা।
আমি বিদ্ধৎজন নই। সমাজের বিভিন্ন চিন্তাধারার পর্যালোচনা করে অন্যের মধ্যে চিন্তার উদ্রেক করার সক্ষমতা আমার নেই। নিজের মনের ভাব প্রকাশ করার জন্য প্রকাশশক্তি বা রচনা শক্তির ক্ষমতা চাই। মানুষ ভাষা, সঙ্গীত, চিত্রকলার সাহায্যে নিজের মনের ভাব প্রকাশ করে। আমার সেইসব কোন শক্তি নেই। মনে ভাব সৃষ্টি হয় কিন্তু প্রকাশ শক্তি বা রচনাশক্তি কম বলে কোন কিছু লিখতে সময় লাগে প্রচুর। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন যে :
"অন্তরের জিনিস কে বাহিরের, ভাবের জিনিসকে ভাষার, নিজের জিনিসকে বিশ্ব মানবের এবং ক্ষণকালের জিনিসকে চিরকালের করিয়া তোলা সাহিত্যের কাজ।"[1]
শ্রী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বলেছেন-
“ভাব ও চিন্তা যেমন ভাষার জন্মদান করে, ভাষাও তেমনি চিন্তাকে নিয়ন্ত্রিত সুসম্বন্ধ ও শৃঙখলিত করে,ভাষা ভিন্ন ভাবা যায় না।........ যেখানে ভাষা নাই সেখানে চিন্তাও নাই..... ভাষা ও সাহিত্য অচ্ছেদ বন্ধনে গ্রথিত। আমার বলিবার বিষয় শুধু এই যে ভাষা থাকলেই সাহিত্য থাকা সম্ভব। অনুভূতির পরিণতিযেমন ভাব ও চিন্তা, ভাষার পরিণতিও তেমনি সাহিত্য।”[2]
নিজের ভাবকে বিশ্বমানবের করার মত ক্ষমতা আমার কোনদিন হবে না। আমার নিজের যে ভাষা প্রকাশ করি তা কোনদিনও সাহিত্যের ভাষা হবে না। আমি সমাজের কোন ঘটনা, বা কোন রীতিনীতির উপর বড়জোর একটা গদ্য রচনা করতে পারবো। আমি আমার অক্ষমতা জানি। তবুও আমার চারপাশের কথা বা মনের কথা লিখতে চেষ্টা করছি।
আমাদের বাঙালি সমাজে বহুদিন ধরে সাময়িক পত্রিকা প্রকাশিত হচ্ছে বর্তমান সাময়িক পত্রিকা লিটিল ম্যাগাজিন নামে পরিচিত। এই সমস্ত পত্রিকাগুলিতে যেমন ইতিহাস, রাষ্ট্রনীতি, অর্থনীতি, সমাজদর্শন প্রভৃতি বিষয় বিশ্লেষণমূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত হচ্ছে তেমনি গল্প ও কবিতাও প্রকাশিত হচ্ছে। এইসব পত্রিকাগুলি প্রগতিশীল চিন্তার বাহক। পরিবর্তনশীল সমাজের বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা ও সামাজিক আন্দোলনের আলোচনা, বিজ্ঞান সচেতনতা ও স্বদেশচিন্তায় পাঠকদের উৎসাহিত করেছে। সাহিত্যসৃষ্টির মাধ্যমে ভাষার উন্নতিও করেছে। বাঙালি জাতির সমাজ ও সংস্কৃতির ইতিহাসে এইসব পত্রিকার সম্পাদকেরা অগ্রগণ্য ভূমিকার অধিকারী। যত লিটিল ম্যাগাজিন বা সাময়িক পত্রিকা প্রকাশিত হবে তত পাঠক ও লেখকের সংখ্যা বৃদ্ধি হবে।
আমি যে পত্রিকা প্রকাশ করতে চলেছি জানিনা কতটা সফল হব। তবু চেষ্টা করছি।পত্রিকা সম্পাদনা করা এমন একটি কাজ যে কাজে পরিশ্রম আছে পারিশ্রমিক নাই, স্বপ্ন আছে সার্থকতা নেই, নিন্দা আছে সাহায্য নেই। আমি যে অঞ্চলে বাস করি সেখানে বহু মহিলা গল্প কবিতা প্রবন্ধ লিখতে পারে তাদের মধ্যে অনেকেই এই পত্রিকা প্রকাশের ব্যাপারে উৎসাহী।
আমাদের এই পত্রিকা কতদিন প্রকাশিত হবে তা নির্ভর করবে যে এই পত্রিকা কতটা প্রগতিশীল চিন্তার বাহক। সম্পাদক মন্ডলী কে পাঠকের পছন্দ অনুয়ায়ী গল্প , কবিতা ও প্রবন্ধ, ভ্রমণ কাহিনী, আত্মজীবনী ইত্যাদি প্রকাশ করার চেষ্টা করতে হবে। আমাদের ক্ষমতার চেয়ে অক্ষমতা বেশি। আধুনিক সমাজে অর্থনৈতিক চাপে মানুষের মনের অনুভূতি গুলি সব চাপা পরে গেছে। তাই অনেক সময় ছোট গল্প বা কবিতায় সে অনুভুতি গুলির প্রকাশ মানুষের মনকে মানবিক করে তোলে ও পাঠক হিসাবে মানুষ সে সব লেখা পড়তে চায়। আমাদের পত্রিকায় প্রান্তিক মানুষের উপর চিন্তা ভাবনার কথা থাকবে। সীমিত অর্থনৈতিক ক্ষমতা ও নতুন লেখক গোষ্ঠী নিয়ে পত্রিকাটি পরিবেশন করছি। আশা করি পাঠকদের সহযোগিতা পাবো।
শুক্লা বসু
অক্টোবর , ২০২৩, কলকাতা।
Comments